ভারতে নারী পাচারকারী চক্রের মূলহোতা রাফি গোয়েন্দা নজরদারিতে

ইমান২৪.কম: ভারতে নারী পাচারকারী চক্রের মূল হোতাকে শনাক্ত করেছে এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান-র‌্যাব। আশরাফুল মণ্ডল ওরফে রাফি নামে এই তরুণের মাধ্যমেই চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক নারীকে ভারতে পাচার করেছিল ঢাকার মগবাজারের বাসিন্দা রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয়। সম্প্রতি এক তরুণীকে যৌন নির্যাতনের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের পুলিশ কর্মকর্তারা প্রথমে মগবাজারের বাসিন্দা হিসেবে টিকটক হৃদয়কে শনাক্ত করে। পরে ঢাকার পুলিশ কর্মকর্তারা বেঙ্গালুরের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে টিকটক হৃদয়সহ ছয় জনকে গ্রেফতার করে ভারতীয় পুলিশ। এ ঘটনায় যৌন নির্যাতনের শিকার তরুণীর বাবা বাদী হয়ে ঢাকার হাতিরঝিল থানায় একটি মামলাও দায়ের করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, যৌন নির্যাতনের ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে নারী পাচারের বিষয়টি সামনে আসে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক ইউনিট নারী পাচারকারীদের শনাক্তে মাঠে নামে। বাংলাদেশ ও ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা যৌথভাবে নারী পাচারকারীদের শনাক্তে একযোগে কাজ শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় এই চক্রের মূলহোতা রাফিকে শনাক্ত করা হয়। রাফিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটকে মডেল হিসেবে সক্রিয়।

এলিট ফোর্স র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, ভারতীয় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া টিকটক হৃদয় ও তার সহযোগীরা জিজ্ঞাসাবাদে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। সেই তথ্য যাচাই-বাছাই করে নারী পাচারকারী চক্রের অন্যতম মূলহোতা আশরাফুল মণ্ডল ওরফে রাফিকে শনাক্ত করা হয়েছে। ভারতে রাফি নামে পরিচিত এই তরুণ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা ঝিনাইদহের শৈলকূপা থানাধীন নাথপাড়া এলাকার পশ্চিমপাড়ার আইন উদ্দিন মণ্ডলের ছেলে। টিকটক হৃদয় সিন্ডিকেটের দলনেতা হলো এই রাফি।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল খায়রুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভারতে নারী পাচারকারী চক্রের মূলহোতা রাফিকে আমরা শনাক্ত করেছি। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’ খুব শিগগিরই তাকে গ্রেফতার করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

জানা গেছে, ঈদের আগে রাফি ভারতের বেঙ্গালুরু থেকে দেশে আসে। এরপর ঝিনাইদহে সরকারি কোয়ারেন্টিনে অবস্থান করছিল। টিকটক হৃদয়ের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সে গা-ঢাকা দেয়। বেঙ্গালুরের যে বাসা থেকে টিকটক হৃদয়সহ অন্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে, রাফি সেই বাসাতেই থাকতো। এই সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ভারতে পাচার করা নারীদের জোর করে কোকেনসহ অন্যান্য মাদক খাওয়ানোর একাধিক ভিডিও উদ্ধার করেছে ওই দেশের পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এই চক্রটি মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-টিকটকে মডেল বানানোর কথা বলে অল্পবয়সী তরুণীদের নিজেদের দলে ভেড়ায়। এরপর তাদের ভারতে ঘুরতে যাওয়া ও চাকরির প্রলোভন দেখায়। যারা তাদের ফাঁদে পা দেয় তাদেরই তারা বৈধ-অবৈধ দুইভাবে ভারতে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে সিন্ডিকেটের ভারতীয় সদস্যদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি বাসায় তুলে জোর করে বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবনে বাধ্য করে। এরপর তাদের সঙ্গে যৌন নির্যাতন ও নির্যাতনের ভিডিও তৈরি করে ব্ল্যাক মেইল করে দেহ ব্যবসা করতে বাধ্য করে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নারী পাচারকারী ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ সিন্ডিকেটের সদস্যরা পাচার করা নারীদের নিজেদের আয়ত্বে রেখে দেহ ব্যবসা করানোর পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন হোটেল-মোটেল ও যৌনপল্লিতে বিক্রি করে দেয়। দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আরও অন্তত ছয় জন বাংলাদেশি তরুণীর সন্ধান পেয়েছে, যাদের টিকটক হৃদয় ও রাফি সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার করেছিল। তাদের নাম-পরিচয় যাচাই করার পাশাপাশি তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা।

এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ জানান, টিকটক হৃদয়সহ বাংলাদেশি যেসব নাগরিককে ভারতীয় পুলিশ গ্রেফতার করেছে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা চলছে। এ জন্য দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে আলোচনা চলছে। একইসঙ্গে যে মেয়েটিকে পাচারের পর যৌন নির্যাতন করা হয়েছে, তাকেও দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

ফেসবুকে লাইক দিন