যে কারণে বাংলাদেশী তরুণীকে এমন পৈশাচিক নির্যাতন করেছে ভারতীয় তরুণ

ইমান২৪.কম: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকদিন ধরে ভাইরাল একটি ভিডিও। তাতে দেখা যাচ্ছে, এক তরুণীসহ চার-পাঁচ জন তরুণ মিলে এক তরুণীকে বিবস্ত্র করছেন। এরপর তার ওপর চালাচ্ছেন পৈশাচিক নির্যাতন। ভিডিওটি দেখে আতঙ্কগ্রস্ত হননি— এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ভিডিওটি কোথাকার, ভিডিওটিতে আছেন কারা, কেনই বা ওই তরুণীর ওপর এমন পাশবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে— এর সবই ছিল অজানা।

শেষ পর্যন্ত এ ঘটনা সম্পর্কিত সব তথ্যই উদঘাটন করেছে পুলিশ। জানা গেছে, ঘটনাটি ভারতে ঘটলেও নির্যাতনের শিকার তরুণীসহ নির্যাতক তরুণ-তরুণীরা সবাই বাংলাদেশি। নির্যাতনের শিকার ওই তরুণীকে ভালো চাকরি দেওয়ার কথা বলে অবৈধ উপায়ে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। সেখান থেকে মেয়েটি পালিয়ে গেলে তাকে খুঁজে বের করে পালানোর কারণেই অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও ভারতীয় পুলিশের বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, বৃহস্পতিবার (২৭ মে) রাতে ওই নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত সবাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে ভারতের ব্যাংগালুরু থেকে। গ্রেফতার হয়েছেন সাগর, মোহাম্মদ বাবা শেখ, হৃদয় বাবু (টিকটক হৃদয় বাবু) ও হাকিল। গ্রেফতার তরুণীর পরিচয় এখনো জানা যায়নি। আর নির্যাতনের শিকার সেই তরুণীর সন্ধানও এখনো পাওয়া যায়নি। পাশের কোনো রাজ্যে তিনি পালিয়ে যেতে পারেন বলে ধারণা করছেন ব্যাংগালুরুর পুলিশ কর্মকর্তারা। গ্রেফতার ব্যক্তিরা সবাই আন্তর্জাতিক একটি পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা পুলিশের।

পালিয়েছিলেন, খুঁজে বের করে পাশবিক নির্যাতন: দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়, অভিযুক্তদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে স্থানীয় পুলিশ বলছে, মেয়েটিকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধ উপায়ে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর তাকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। সেখান থেকে মেয়েটি কৌশলে পালিয়ে যান। কিন্তু এই চক্রটি তাকে আবার খুঁজে বের করে। পালিয়ে যাওয়ার শাস্তি হিসেবে তাকে ‘শিক্ষা দিতে’ তার ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালায়। সেখানেই শেষ নয়, সেই নির্যাতনের ঘটনাটি ভিডিও করে তারা ছড়িয়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

অবৈধভাবে ভারতে যাওয়া এবং পাচার চক্রের বিষয়টি জানিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ব্যাংগালুরু পুলিশের প্রধান কামাল প্যান্ট তার টুইটে বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, অভিযুক্তরা সবাই একই দলের অংশ এবং তারা সবাই বাংলাদেশি। নির্যাতনের শিকার তরুণীও বাংলাদেশি। তাকে অবৈধভাবে পাচার করে ভারতে আনা হয়েছিল। টাকা-পয়সা বিষয়ক কারণে হয়তো তার ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন চালানো হয়েছিল।

ব্যাংগালুরু পুলিশের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে ভারতে এসে তারা ব্যাংগালুরুতে থাকছিল। মেয়েদের পাচার করে এনে পতিতাবৃত্তি করাত এই চক্রটি। নির্যাতনের শিকার মেয়েটিকেও তারা ভারতে এনে পতিতাবৃত্তি করাতে বাধ্য করে। মেয়েটি সুযোগ বুঝে কিছু টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু চক্রটি মেয়েটিকে খুঁজে বের করে। তার পালিয়ে যাওয়া এবং পরে টাকা-পয়সা দিতে অস্বীকার করার কারণে তার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়।

কামাল প্যান্ট জানিয়েছেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিও ও প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ধর্ষণ ও নির্যাতনের একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুই নারীসহ ছয় জনকে আসামি করা হয়েছে এতে। নির্যাতনের শিকার তরুণীকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

এদিকে, ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর সবশেষ খবর থেকে জানা যাচ্ছে, বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতারের পর শুক্রবার সকালে টিকটক হৃদয়সহ তার সহযোগীদের ব্যাংগালুরু পুলিশ তাদের বাসস্থানে নিয়ে গিয়েছিল তদন্তের জন্য। সেখানে পুলিশের ওপর হামলা করে টিকটক হৃদয় ও সাগর। তারা পালিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করে। পরে পুলিশ গুলি চালালে টিকটক হৃদয় ও সাগর হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাদের সরকারি একটি হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করা হচ্ছে।

যেভাবে গ্রেফতার টিকটক হৃদয়সহ সহযোগীরা এর আগে, ওই ভিডিওটি ভাইরাল হলে ডিএমপি’র সাইবার মনিটরিং টিমের নজরে আসে। তারা অনুসন্ধান শুরু করে। নির্যাতক হিসেবে মগবাজারের রিফাতুল ইসলাম ওরফে ‘টিকটক হৃদয় বাবু’কে শনাক্ত করে পুলিশ। তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানা যায়, চার মাস আগে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে তাকে।

পরে পুলিশ কৌশলে হৃদয়ের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে করে জানতে পারে, তিনি মাস তিনেক আগে ভারতে গেছেন। ঘটনাটি সেখানেই ১৫-২০ দিন আগে ঘটেছে। নির্যাতনের শিকার মেয়েটির বাড়ি কিশোরগঞ্জ। বাসায় হাতিরঝিল এলাকায়। মেয়েটির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাও মেয়েটিকে চিনতে পারেন। পরে মেয়েটির বাবা হাতিরঝিল থানায় মামলা দায়ের করেন।

ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর বলছে, ভিডিওটি আসাম-পশ্চিমবঙ্গেও ভাইরাল হয়। এর মধ্যে ২৩ মে রাজস্থানের যোধপুরে নাগাল্যান্ডের এক তরুণী আত্মহত্যা করেন। এই ভিডিও’র তরুণীই তিনি— এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সূত্র ধরে ভিডিও থেকে নির্যাতকদের ছবির স্ক্রিনশট নিয়ে আসাম পুলিশ টুইটারে পোস্ট করে। তাদের সন্ধান দিতে পারলে তার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করে। পরে ভারতের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজু এক টুইটে এ ঘটনায় জড়িতদের ধরতে বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান। আসাম ‍পুলিশ থেকেও সম্ভাব্য কিছু ফোন নম্বর দেওয়া হয় ব্যাংগালুরু পুলিশকে। এর মধ্যে একটি ফোনকলের সূত্র ধরে ব্যাংগালুরু পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বৃহস্পতিবার (২৭ মে) সাংবাদিকদের জানান, অবৈধভাবে ভারতে নারী পাচারের সঙ্গে এই চক্রটি জড়িত বলে ধারণা করছেন তারা। টিকটক হৃদয় ও তার সহযোগীদের ধরতে ভারতের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তাদের গ্রেফতারের খবর পাওয়ার বিষয়টিও জানিয়েছেন ডিসি শহীদুল্লাহ। তিনি বলেন, ভারত থেকে তাদের দেশ নিয়ে আসার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

ফেসবুকে লাইক দিন