হেফাজতের সাথে চরমোনাইয়ের কোন বিরোধ নেই: মুফতি ফয়জুল করিম

ইমান২৪.কম: হেফাজতের সাথে চরমোনাই এর কোনো বিরোধ নেই বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর নায়েবে আমির সৈয়দ মুফতি ফয়জুল করিম। গতকাল রোববার (১৫ নভেম্বর) রাতে নরসিংদী এলাকার একটি মসজিদে অনুষ্ঠিত তরবিয়তী ইজতেমায় এ মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, আজকে অনেকেই হেফাজত আর চরমোনাইকে বিপরীত মেরুতে দাঁড় করাবার চেষ্টায় আছে! এরাতো বিপরীত মেরুর লোক না। হেফাজতের সাথে চরমোনাই এর তো কোনো সংঘর্ষ নেই। তাদের রুট আর আমাদের রুট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাজনৈতিক সংগঠন। হেফাজতে ইসলাম অরাজনৈতিক সংগঠন। দুটোর রুটিই ভিন্ন। ফাসেল হবে কিভাবে? আপনি সংঘর্ষে দাঁড় করান কেন? তারা কি আমার প্রতিপক্ষ? আমার প্রতিপক্ষ ওই ব্যক্তি যে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর হুকুম কায়েম করতে বাধা দেয়! আর যে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর হুকুম কায়েম করতে বাধা দেয় না বরং একই কাজ করে সে আবার আমার প্রতিপক্ষ হয় কিভাবে? আর দ্বিতীয় কথা হল হেফাজত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক সংগঠন। তাদের কোনো মার্কা নেই। ইসলামী আন্দোলনের মার্কা আছে।

কাজেই আপনাদের সাথে ফাসেল বা বিপরীত হবে কিভাবে? প্রতিপক্ষ হবে কিভাবে? প্রতিপক্ষ বানাচ্ছেন কেন? কে বানাচ্ছে এটা? হেফাজতের সাথে চরমোনাইর বিরোধ যারা করছে তারা শত্রু? তারা অবশ্যই দুশমন। উভয়ের দুশমন। কেননা আমরা আল্লাহর জমিনে আল্লাহর হুকুমত কায়েম করার চেষ্টা করছি। আর তারা প্রতিবাদ করার জন্য চেষ্টা করছে। একটা হল কায়েম করা। আরেকটা হল প্রতিবাদ করা। আর প্রতিবাদের জন্য একটি স্টেজ থেকে ভিন্ন ভিন্ন স্টেজ হওয়া ভালো। আজকে যদি এক স্টেজ থেকে প্রতিবাদ করি। যে কোনো প্রতিবাদ যতই বড় হোক না কেন একবার হলো। কিন্তু প্রতিবাদ যদি ভিন্ন ভিন্ন স্টেজ থেকে হয়; তাহলে প্রতিবাদ দীর্ঘ হলো। সার্বজনীন হলো। এজন্য যারা কোনো প্রতিবাদমুখী সংগঠন তারা আমাদেরই সংগঠন। কারণ প্রতিবাদ করতে গিয়ে যখন কোন হুকুমত কায়েম হবে, তখন তাদের যেহেতু কোনো মার্কা নেই। তাহলে তারা ইসলামের পক্ষেই সাপোর্ট দিবে। আর যদি তখন ইসলামের বাইরে সাপোর্ট দেয়, তখন আমরা মনে করব, তারা ইসলামের পক্ষের শক্তি না বরং ইসলামের বিপক্ষে শক্তি। তাই তুমি কেন তাকে বিপরীত দাঁড় করাচ্ছো? হেফাজতের সাথে আমাদের কিসের সংঘর্ষ? হেফাজত আর আমরা ভিন্ন কোনো বস্তু নয়; যখন উভয়টির রুটই ভিন্ন, তখন মোকাবেলা হবে কিভাবে? সেও কর্মসূচি দেবে। তুমিও কর্মসূচি দাও। সমস্যা কি?

তিনি সবার উদ্দেশে প্রশ্ন করে বলেন, আপনারা সবাই যদি ঐক্য চান, তাহলে সমস্ত মাদ্রাসাগুলোকে এক করে ফেলুন। আচ্ছা সমস্ত মাদ্রাসাগুলো এক করা ভালো নাকি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় করা ভালো? যদি ঐক্য চান তাহলে সমস্ত মসজিদগুলোকে এক করে ফেলুন। আচ্ছা সমস্ত মসজিদ কি এক জায়গায় আসা ভালো নাকি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় থাকা ভালো? যদি ঐক্য চান তাহলে সমস্ত মাহফিলগুলোকে এক করে ফেলুন। মাহফিল কি এক জায়গায় হওয়া ভালো নাকি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় হওয়া ভালো? আমি তো মনে করি এক হয়ে যাওয়া এটা মারাত্মক কঠিন একটি সমস্যা।

তিনি বলেন, এটা দুই কারণে; এক নম্বর কারণ হলো, যদি প্রতিবাদগুলো এক স্টেজ থেকে না হয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্টেজ থেকে হয় তাহলে এটা ভালো। দুই নম্বর তারণ হলো, যদি সারা পৃথিবীতে একটাই সংগঠন হয় তাহলে গোটা দুনিয়ার ইসলামের দুশমনরা এটাকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করবে। এদেরকে কেনার চেষ্টা করবে। নেতাদের হাত করার চেষ্টা করবে। যেমনটা আমরা বিগত দিনে দেখেছি। যখনই কোন সংগঠন বড় রূপ লাভ করেছে, তখন তার নেতাদের কনভার্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। যার মাধ্যমে পুরো দলটাই বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু যদি সব জায়গায় হকপন্থীরা থাকে, তাহলে তাদের হাত করা দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সবাইকে কনট্রোল করা যায় না। এটা সম্ভব না।

এজন্য আপনারা যারা ভাবতেছেন, সকল সংগঠনগুলো এক হয়ে যাক, কিন্তু আমি দেখতেছি আলাদা আলাদা থাকলে ভালো। যেমন একই জায়গায় সকল মাদ্রাসা হওয়ার চেয়ে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় মাদ্রাসা হওয়া ভালো। একই জায়গায় সকল মসজিদ হওয়ার চেয়ে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় হওয়া ভালো। একই জায়গায় সকল মাহফিল না হয়ে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় হওয়া ভালো। একই জায়গায় প্রতিবাদ না হয়ে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ হওয়া ভালো। এজন্য ইসলামী সংগঠনগুলো এখনই এক না হয়ে যখন প্রয়োজন হবে তখন সবাই এক হয়ে যাবে। কিন্তু প্রয়োজনের আগে সবাই ভিন্ন ভিন্নভাবে কাজ করা ভালো। এটা আমার দৃষ্টিভঙ্গি। এটা আমার দর্শন। আর এই দর্শনটা কেন? কারণ, আমি দেখেছি ইসলামের দুশমনরা বিভিন্ন সময়ে এদের কন্ট্রোল করে ফেলে। যে কোনো ধরনের লোভ দেখিয়ে। হয়তো বা টাকার লোভ। অথবা ক্ষমতার লোভ। অথবা পদের লোভ। যেকোনো এক কারণ দেখিয়ে কন্ট্রোল করেছেন। এতে ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সব সময় ঐক্য চায়। এরা সব সময় ঐক্যপ্রয়াসী। এদের চেয়ে ঐক্য বেশি চাওয়ার মত কেউ নাই।কিন্তু আমরা অরিজিনাল অন্তর থেকে ঐক্য চাই। আর অনেকে মুখ থেকে ঐক্য চায়। এটা হলো দুটোর মাঝে পার্থক্য। এর দলিল হল, আমরা সব সময় বলি যে, ঐক্য হবে নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে। নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে যখন ঐক্যের ডাক যে দিবে আমরা সেখানে এক নম্বরে আছি। কিন্তু যখনই ঐক্য গড়তে চায় তখনই দেখি সেখানে নীতি ও আদর্শ থাকে না। পিছনে কালো থাবা থাকে। ওই কালো থাবার ঐক্য হয়। কিন্তু অরিজিনাল ইসলামী হুকুমত কায়েম হয় না। এজন্য আমি সবাইকে বলবো যে খবরদার! ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কোন দুনিয়াবী লোভ-লালসার সংগঠন নয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একমাত্র রেজায়ে মাওলা বা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এক সংগঠনের নাম। কাজেই তাজকিয়ায়ে নফস করতে হবে। তাজকিয়া ছাড়া হবে না। আজকে তাজকিয়ায়ে নফস আমাদের মাঝে নেই। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রতিটি নেতাকর্মীকে বলবো, কোন সময় কোন অহেতুক-বেহুদা কারো গীবত শেকায়েতে যুক্ত হবেন না।

বর্তমানে ফেসবুককে অনেকে ওহী মনে করে। এটা আমাদের নীতি আদর্শ না। হঠাৎ করে আমাদের সাজিয়ে, আমাদের নাম করে, আমাদের প্ল্যাটফর্মের পরিচয় দিয়ে কোনো একজন কারো বিরুদ্ধে একটি কমেন্ট করেছে। যেটা আমাদের নীতি ও আদর্শের সম্পূর্ণ উল্টো। সম্পূর্ণ খেলাফ। ব্যস তাকে যখন দেখিয়েছে সে তো মনে করবে এটা চরমোনাই হুজুরের কথা। আসলে এটা আমাদের মত না। কথাও না। এটা আমাদের আদর্শ না। এটা আমরা জানিও না। মানিও না। এটা নিয়ে আমাদের গালাগালি শুরু করে।

তিনি বলেন, আমি যা মনে করি, বর্তমানে ঐক্যের সবচেয়ে বড় বাধা হলো ফেসবুক। বর্তমানে পরিকল্পিতভাবে ফেসবুকে অনৈক্য সৃষ্টি করা হয়। বিশেষ করে আমরা যারা মুরুব্বী আছি, আমরা তো ফেসবুককে ওহী মনে করি। এর জন্য হেফাজত আমাদের প্রতিপক্ষ না। আমাদের মোকাবেলা না। আমাদের বিপরীত কোন সংগঠন না। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের কোন কথা বলার প্রয়োজন নেই। কিছুর দরকার নেই। তাদের সাথে আমাদের কোন মতবিরোধ নেই। মুখোমুখি সংঘর্ষের কোন প্রশ্নই আসে না। তারা নন পলিটিক্যাল। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পলিটিক্যাল। তাহলে সংঘর্ষ হবে কিভাবে? হবার যুক্তি কি?

তারা যদি অন্যের মোকাবেলা করতে চায় আমরাও তো অন্যের মুকাবেলা করতে চাই। তারা যদি অনৈসলামিক কাজ ফেরাতে চায়। আমরাও তো অনৈসলামিক কাজ ফেরাতে চাই। তাহলে মোকাবেলা হবে কেন? প্রতিপক্ষ হবে কেন? কাজেই কোনো অবস্থাতেই কেউ যেন প্রতিপক্ষ না মনে করি, তাহলে আমি মনে করব, এরাই আসলে মাঝখানে ফেতনা ছড়াতে চায়।

ফেসবুকে লাইক দিন