‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না’ : ৩৩ মামলায় ‘ভুল’ আসামি ৩ বছর ধরে জেলে

ইমান২৪.কম: ‘স্যার, আমি জাহালম। আমি আবু সালেক না…আমি নির্দোষ।’ আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো লোকটির বয়স ৩০-৩২ বছরের বেশি না। পরনে লুঙ্গি আর শার্ট। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এ বিচারকের উদ্দেশে তাঁকে বারবার বলতে দেখা যায়, ‘আমি আবু সালেক না।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আবু সালেকের বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির ৩৩টি মামলা হয়েছে। কিন্তু আবু সালেকের বদলে জেল খাটছেন, আদালতে হাজিরা দিয়ে চলেছেন এই জাহালম। তিনি পেশায় পাটকলশ্রমিক।

জাহালমের কারাবাসের তিন বছর পূর্ণ হবে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি। দুদক এখন বলছে, জাহালম নিরপরাধ প্রমাণিত হয়েছেন। তদন্ত করে একই মত দিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও। ফলে একটি মামলায় তাঁর জামিন হয়েছে। আরও ৩২টি মামলায় জামিন পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন তিনি।

দুদকের একটি ‘সর্বনাশা’ চিঠি:
পাঁচ বছর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি চিঠির মাধ্যমে জাহালমের ঝামেলা শুরু। জাহালমের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঠিকানায় দুদকের একটি চিঠি যায়। সেই চিঠিতে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে নয়টায় জাহালমকে হাজির হতে বলে দুদক। জাহালম তখন দূরে, নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলে শ্রমিকের কাজ করছেন।

দুদকের চিঠিতে বলা হয়, ভুয়া ভাউচার তৈরি করে সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত আবু সালেক নামের এক লোক, যাঁর সোনালী ব্যাংক ক্যান্টনমেন্ট শাখায় হিসাব রয়েছে। আবু সালেকের ১০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ভুয়া ঠিকানাগুলোর একটিতেও জাহালমের গ্রামের বাড়ির কথা নেই। রয়েছে পাশের আরেকটি গ্রামের একটি ভুয়া ঠিকানা। কিন্তু সেটাই কাল হয়ে দাঁড়াল জাহালমের জীবনে।

নির্ধারিত দিনে দুই ভাই হাজির হন দুদকের ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। জাহালম বুকে হাত দিয়ে বলেছিলেন, ‘স্যার, আমি জাহালম। আবু সালেক না। আমি নির্দোষ।’

তাঁর ভাই শাহানূর মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, দুদক কর্মকর্তারা জাহালমের কাছে জানতে চান, আবু সালেক নাম দিয়ে তিনি সোনালী ব্যাংকে হিসাব খুলেছিলেন কি না। জাহালম দুদক কর্মকর্তাদের স্পষ্ট করে জানান, সোনালী ব্যাংকে তাঁর কোনো হিসাব বা লেনদেন নেই। তিনি সামান্য বাংলা জানেন। ইংরেজিতে স্বাক্ষরও করতে পারেন না। আবু সালেক নামে ব্যাংকের হিসাবটিও তাঁর না। হিসাব খোলার ফরমে আবু সালেকের যে ছবি, তা-ও তাঁর নয়।

অথচ সেদিন দুদকে উপস্থিত বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা সবাই জাহালমকেই ‘আবু সালেক’ বলে শনাক্ত করেন। কারণ, দুজনই দেখতে প্রায় একই রকম।

দুদকে হাজিরা দিয়ে জাহালম সোজা চলে যান নরসিংদীর জুট মিলের কর্মস্থলে। এর দুই বছর পর টাঙ্গাইলের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে জাহালমের খোঁজ করতে থাকে পুলিশ। সেখান না পেয়ে ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশালের মিল থেকে জাহালমকে আটক করা হয়।

জাহালম তখন জানতে পারেন, তাঁর নামে দুদক ৩৩টি মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ, তিনি বড়মাপের অপরাধী। পুলিশের কাছেও জাহালম একই কথা বলেন, ‘স্যার, আমি জাহালম। আবু সালেক না। আমি নির্দোষ।’ কেউ শুনল না এই আকুতি। তাঁর ঠাঁই হয় কারাগারে।

কারাগারে কেটে যায় আরও দুটি বছর। জাহালমকে যতবার আদালতে হাজির করা হয়, ততবারই তিনি বলেন, ‘আমি জাহালম। আমার বাবার নাম ইউসুফ আলী। মা মনোয়ারা বেগম। বাড়ি ধুবড়িয়া গ্রাম, সাকিন নাগরপুর ইউনিয়ন, জেলা টাঙ্গাইল। আমি আবু সালেক না।’ তাঁর ভাই শাহানূর দিনের পর দিন আদালতের বারান্দায় ঘুরতে থাকেন। হাজতখানার পুলিশ থেকে শুরু করে আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাঁকে পান, তাঁকেই বলতে থাকেন, ‘আমার ভাই নির্দোষ।’

অথচ ব্যাংক, দুদক, পুলিশ ও আদালত—সবার কাছেই জাহালম হলেন ‘আবু সালেক’ নামের ধুরন্ধর ব্যাংক জালিয়াত। এই চারটি পক্ষের ভুলেই হারিয়ে গেল তাঁর জীবনের তিনটি বছর। জাহালমের স্ত্রী থাকেন নরসিংদীতে। তিনিও সেখানকার একটি কারখানার শ্রমিক।

বৃদ্ধা মা থাকেন গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ধুবড়িয়া গ্রামে। ছেলে আর টাকা পাঠাতে পারেন না। তাই মনোয়ারা বেগম প্রতিদিন অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। ১৯ জানুয়ারি ধুবড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ১০ শতাংশ জমির ওপর দুটি টিনের ঘর জাহালমদের। মা মনোয়ারা বেগম জানালেন, এই ভিটেটুকু ছাড়া তাঁদের আর কিছুই নেই। প্রতিবেশীরাও বললেন, জেলে যাওয়ার পর চরম বিপাকে পড়েছে জাহালমের পরিবার।

আরও পড়ুন:  নারায়ণগঞ্জে পুলিশ কনস্টেবলের নেতৃত্বে স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণ

অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ছাত্রলীগ কর্মীর পায়ের রগ কেটে দিয়েছে প্রতিপক্ষ

সিজার করতে গিয়ে নবজাতককে কেটে ফেললেন চিকিৎসক : আটক ৩

শিশুদের দিয়ে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি, ভুয়া স্ত্রীসহ পুলিশের এসআই আটক

আ.লীগ এক হাজার বছর চেষ্টা করলেও ২৮৮ টি আসন পেতে পারে না: কর্নেল অলি

আগামী ১৫, ১৬ ও ১৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ইজতেমা : ধর্ম মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে সিদ্ধান্ত

ফেসবুকে লাইক দিন