সরছে কেমিক্যাল, তবে এসব কেমিক্যাল যাচ্ছে কোথায়?

ইমান২৪.কম: চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির পর টনক নড়েছে কর্তৃপক্ষের। সরানো শুরু হয়েছে পুরান ঢাকার বিভিন্ন গুদামে থাকা কেমিক্যাল বা রাসায়নিক। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে গতকাল শনিবার অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্থ হাজী ওয়াহিদ ম্যানশনের নিচ থেকে রাসায়নিক সরানো শুরু করেন। তার সামনেই একটি ট্রাকে রাসায়নিক ভর্তি করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় মেয়র সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেমিক্যাল সরানোর কাজ শুরু হল। এরপর কোন বাড়ির নিচে কেমিক্যাল পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে এলাকাবাসী প্রশ্ন তুলেছেন, এসব রাসায়নিক যাচ্ছে কোথায়?

তারা বলছেন, কেরানীগঞ্জে বিসিক শিল্প নগরীর পাশে যেখানে রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের যাওয়ার কথা সেই জায়গা তো এখনো প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে শুধুই রাসায়নিককে দুষতে নারাজ চুড়িপট্টির খুচরা ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ‘আগুনের জন্য আরো অনেক বিষয়ই দায়ী। কেমিক্যালের ড্রামগুলো সরিয়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জে বিসিক শিল্প নগরীর পাশে কেমিক্যাল ব্যবসায়ী, রঙ ব্যবসায়ী ও ছাপাখানার মালিকদের ১০ ও ১৫ কাঠা করে জমি দেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। রঙ ব্যবসায়ী ও ছাপাখানার মালিকরা এই জমি নিলেও রাসায়নিক ব্যবসায়ীরা কোন জমি নেননি। ফলে তাদের জন্য কোন স্থাপনা সেখানে গড়েও উঠেনি।

তবে বিস্ফোরক অধিদফতরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, ২০১০ সালের নিমতলীর ঘটনার পর অতি দাহ্য পদার্থের ৩০টি গুদাম কেরানীগঞ্জ বিসিক শিল্প এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। তখন অন্যরা যেখানে যেতে রাজি না হওয়ায় তাদের আর সরানো যায়নি। গতকাল শনিবার চকবাজারে হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এফবিসিসিআই’র পরিচালক ও পুরান ঢাকা ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আবু মোত্তালিব ইত্তেফাককে বলেন, ‘সব কেমিক্যাল ব্যবসায়ীকেই পুরান ঢাকা ছেড়ে যেতে হবে। আমরা যেতেও প্রস্তুত। কিন্তু যাব কোথায়? সেই জায়গাটাতো আমাদের প্রস্তুত করে দিতে হবে।

সবাই শুধু বলছেন, চলে যাও। কোথায় যাব সেটা কেউ বলছেন না। এভাবে ঢালাও কথা না বলে জায়গা প্রস্তুত করে দেন, অবশ্যই সবাই চলে যাবে।’ নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি পূরণে সরকার এবার ‘আটঘাট’ বেঁধে নেমেছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের দেখতে গিয়ে শনিবার এ কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, পুরান ঢাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ সব রাসায়নিকের গুদাম এবং অবকাঠামো সরিয়ে ফেলার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী সিটি করপোরেশন এর মধ্যে উদ্যোগও নিয়েছে।

গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, চুড়িহাট্টা মোড়ের অগ্নিকাণ্ডে হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন নামের যে ভবনটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার বেইজমেন্টে বেআইনিভাবে রাখা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সরাতে কাজ শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। এর মধ্য দিয়ে পুরান ঢাকার সব রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা অপসারণের কাজ শুরু হল জানিয়ে মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, সিটি করপোরেশনের অভিযানের সময় কারো বাড়িতে অবৈধ রাসায়নিকের মজুদ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে ওয়াহেদ ম্যানশনের রাসায়নিকের গুদাম ঘুরে দেখেন মেয়র। এরপর দুই দফায় দুটি ট্রাক বোঝাই করে ওই মালামাল সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়। চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মুরাদ বলেন, সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে এসব রাসায়নিক কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রকল্প এলাকায় রাখা হচ্ছে। কারো বাড়িতে রাসায়নিকের মজুদের খোঁজ জানা থাকলে তা সিটি করপোরেশনের অফিস, কাউন্সিলরের অফিসে বা থানায় জানাতে অনুরোধ করেন মেয়র। তিনি বলেন, একটি সিসিটিভি ভিডিওতে দেখা গেছে, গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তারপরও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পেলে বিস্তারিত জানা যাবে।

দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা সকালে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন। এ কমিটির আহ্বায়ক মো. আকরাম হোসেন জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে করণীয় নির্ধারণে কাজ করছেন তারা। তদন্তে কী পাওয়া গেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় প্লাস্টিকের দানা আর প্রচুর স্প্রে’র বোতল ছিল। আগুন ছড়িয়ে পড়ার বড় কারণ এটা। দ্বিতীয় বিষয়টি হল, এখানে রাস্তা সরু, এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ। আগুন লাগার পর যানবাহন দ্রুত চলতে পারেনি। গতকাল অগ্নিকাণ্ডের জায়গায় লোকজন জড়ো হয়ে দুর্ঘটনা নিয়েই আলোচনা করছিলেন। মৃত্যু ছাপিয়ে তাদের আলোচনার মূল বিষয় ছিল রাসায়নিক। দুর্ঘটনার জন্য রাসায়নিককে দায়ী করা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

আবদুস সালাম নামে একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকে নিজেদের বাড়ির নিচতলায় রাসায়নিক গুদাম, প্রসাধন সামগ্রীর পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান ভাড়া দিয়েছেন। তিনি এই দুর্ঘটনার জন্য রাসায়নিককে দায়ী করতে নারাজ। তার ভাষ্য, গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার থেকে দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাই এ দুর্ঘটনায় রাসায়নিককে দায়ী করা যুক্তিহীন। তিনি বলেন, কেমিক্যাল থাকলে পুরা চকবাজার উড়ে যেত। গ্যাস সিলিন্ডার থেকে এটা হয়েছে। সাংবাদিকেরা সত্য লিখছেন না।’ এ সময় সেখানে উপস্থিত কয়েকজন খুচরা ব্যবসায়ীও বলেন, আগুনের জন্য শুধু রাসায়নিক দায়ী না।

তবে নন্দ কুমার দত্ত লেনের চাল ব্যবসায়ী মো. সালাউদ্দিন মনে করেন প্লাস্টিক, রাসায়নিকের মজুদের কারণে আগুন এত বেশি বিস্তৃত হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা কতবার বলছি, আবাসিক এলাকা থেকে এসব বিপজ্জনক জিনিস সরান। থানার লোকজনের সামনেই এসব ব্যবসা হইত। থানায় গিয়া অভিযোগ দিয়াও তো কোনো লাভ হয় নাই। নিমতলীর ঘটনায় কারো শিক্ষা হয় নাই। এই এলাকার বাড়িওয়ালারাও বেশি টাকার লোভে গোডাউন ভাড়া দেয়, আর তাতে এসব মালামাল মজুদ করা হয়। দোষ তাদেরও কম না। সবাই সমান দোষী।’

আরও পড়ুন: বন্ধ হচ্ছে গাড়িতে সিলিন্ডার গ্যাস!

স্কুল-কলেজের ছাত্রদের চুলে রঙ ও বিশেষ ছাঁটে নিষেধাজ্ঞা

ফেসবুকে লাইক দিন