সন্তান জন্মের পর পবিত্র কোরআন ও হাদীসের আলোকে সন্তানের জন্য কি কি করণীয় আসুন জেনে নেই

মানব জাতির সমস্ত প্রকার কল্যান, সভ্যতা, বিজ্ঞানসম্মত জীবনের বাস্তব শিক্ষা দিয়ে গেছেন আমাদের আখেরী নবী হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।  শিশু সন্তান জন্ম নেয়ার পর কি করতে হবে এব্যাপারেও তিনি বাস্তব জীবনে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। নবজাতক জন্মের পর রাসূলের সুন্নত অনুযায়ী আমাদের কি করনীয় তা জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরী। সন্তান জন্মের পর পবিত্র কোরআন ও হাদীসের আলোকে সন্তানের জন্য কি কি করণীয় আসুন জেনে নেই –

>সন্তান জন্ম নেবার পর পিতা-মাতার উপর প্রথম কর্তব্য হল তাকে ভাল করে গোসল দিবে। প্রথমে লবন পানি দিয়ে তারপর খালেস পানি দিয়ে গোসল দিবে। তাহলে ফোড়া, গোটা ইত্যাদি অনেক রোগ থেকে শিশু মুক্ত থাকবে ইনশাআল্লাহ। শরীরে বেশি ময়লা থাকলে কয়েকদিন পর্যন্ত লবন পানি দিয়ে গোসল করাতে হবে, ময়লা বেশি না হলে শুধু খালেস পানি দিয়ে গোসল করালেই হবে।

>গোসল শেষে ভেজা কাপড় দিয়ে শিশুর নাক, কান, গলা, মাথা ভালভাবে পরিস্কার করতে হবে। সাধারনত অপরিচ্ছন্নতা থেকে শিশুর বহু রোগ জন্ম নেয় বলে বিশেষজ্ঞরা বলেন।

#তবে বাচ্চার স্বাস্থগত ক্ষতি হওয়ার আশংকা থাকলে তাকে গোসল দেয়া জরুরী নয়। তবে যৌক্তিক কোন কারণ না থাকলে ময়লাসহ রাখা উচিত নয়। কারণ ময়লা ও নাপাক ব্যক্তির কাছে ফেরেস্তা আসে না।

>গোসলের পর নবজাতক শিশু কোন কিছু খাওয়ার পূর্বেই মৃদু আওয়াজে তার ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দিতে হবে। দুনিয়াবী কোন আওয়াজ তার কানে পৌঁছার পূর্বেই যেন সে আল্লাহ্‌ পাক ও উনার হাবীবের মহত্ত বড়ত্ত শুনতে পায় এবং শয়তান তার উপর কোন প্রভাব ফেলতে না পারে।

عن حسين قال : قال رسول الله – صلى الله عليه و سلم – : من ولد له فأذن في أذنه اليمنى وأقام في أذنه اليسرى

হযরত হুসাইন রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন যে, যার সন্তান হয়, সে যেন তার ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত দেয়। {শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৮৬১৯, মুসনাদে আবী ইয়ালা, হাদীস নং-৬৭৮০, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং-৭৯৮৫}

>যদি সম্ভব হয় শিশুকে প্রথম দুধ পান করানোর আগে কোন বুযুর্গ ব্যক্তির কাছে নিয়ে সামান্য খেজুর চিবিয়ে শিশুর মুখে দিলে ভালো। এটাকেই তাহনীক বলে। তাহনীক করা মুস্তাহাব। পরহেজগার, মুত্তাক্বী, আল্লাহ্‌ওয়ালা ব্যক্তিত্বের দ্বারা তাহনীক করানো উচিত। হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের শিশু সন্তানগণের তাহনীক করিয়ে দিতেন। অতঃপর শিশু মায়ের দুধ পান করতে শুরু করতে পারে।

عن أبى موسى قال ولد لى غلام فأتيت به النبى -صلى الله عليه وسلم- فسماه إبراهيم وحنكه بتمرة

হযরত আবু মুসা আশআরী রাঃ থেকে বর্নিতঃ তিনি বলেন, আমার একটি ছেলে আমি তাকে রাসূল (সাঃ) এর কাছে নিয়ে এলাম, তখন রাসূল (সাঃ) তার নাম রাখেন ইবরাহীম এবং তাকে তাহনীক করান খেজুর দিয়ে। -{সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৫৭৩৯, সুনানুল বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-১৯০৮৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৯৫৭০, মুসন্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-২৩৯৪৮}

>শিশু জন্ম নেয়ার সাত দিনের দিন মাথার চুল ফেলে চুল ওজন করে, সে ওজন পরিমাণ স্বর্ণ বা রোপা বা তার মূল্য দান করা মুস্তাহাব।

عن جعفر بن محمد عن أبيه أنه قالوزنت فاطمة بنت رسول الله صلى الله عليه وسلم شعر حسن وحسين وزينب وأم كلثوم فتصدقت بزنة ذلك فضة

হযরত যাফর বিন মুহাম্মদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তার পিতা বলেছেন-হযরত ফাতেমা বিনতে রাসূল সাঃ হাসান, হুসাইন, জয়নব ও উম্মে কুলসুমের চুল ওজন করে সে পরিমাণ রোপা সদকা করে দিয়েছেন। {মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-১৮৩৯, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৮২৬২, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-১৯০৭৯}

>শিশু সন্তান জন্ম নেয়ার সপ্তম দিনে ছেলে হলে দু’টি বকরী বা গরু-মহিষের সাত ভাগের দুই ভাগ, আর মেয়ে হলে একটি বকরী বা গরু-মহীষের সাত ভাগের একভাগ আক্বিকা হিসেবে জবাই করা মুস্তাহাব। আক্বিকার পশুর হাড্ডি ভাঙ্গবে না। আত্বীয় স্বজন এবং গরীব দুঃখীদের গোস্ত খাওয়াবে। নিজেরাও খাবে। সেই সাথে এই দিনে ছেলেটির সুন্দর নাম রাখাও মুস্তাহাব।

عن سمرة بن جندب أن رسول الله -صلى الله عليه وسلم- قال « كل غلام رهينة بعقيقته تذبح عنه يوم سابعه ويحلق ويسمى

হযরত সামুরা বিন জুনদুব রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-প্রত্যেক বালকের পক্ষ থেকে আক্বিকা হল বন্ধক স্বরূপ, যা তার পক্ষ থেকে সপ্তম দিনে জবাই করবে, এবং তার মাথা মুন্ডাবে, এবং তার নাম রাখবে। {সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২৮৪০, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-১৯০৪৭, সুনানে দারেমী, হাদীস নং-১৯৬৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২০০৮৩}

عَنْ أُمِّ كُرْزٍ الْكَعْبِيَّةِ قَالَتْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ « عَنِ الْغُلاَمِ شَاتَانِ مُكَافِئَتَانِ وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ

উম্মে কুরযিল কা’বিয়্যাহ রাঃ বলেন-আমি রাসূল সাঃ কে বলতে শুনেছি যে, ছেলের জন্য দু’টি একইমানের বকরী ও মেয়ের পক্ষ থেকে একটি বকরী [আক্বিকা দিবে]। {সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২৮৩৬, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং-১৫১৩, সুনানে দারেমী, হাদীস নং-১৯৬৬, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৫৩১৩, মুসনাদে আবী ইয়ালা, হাদীস নং-৪৬৪৮, মুসনাদে ইসহাক বিন রাহহুয়া, হাদীস নং-১২৯০}

>সাত দিনের মাথায় আক্বিকা দিতে না পারলে চৌদ্দ দিনের মাথায়, না হলে একুশ দিনের মাথায় আক্বিকা দিতে পারবেন। অথবা বালেগ হওয়ার আগে যে কোন সময় জন্মের সাত দিন হিসেব করে সাত দিনের মাথায় আক্বিকা দেয়া উত্তম। তবে জরুরী নয়। কুরবানীর সাথেও আক্বিকা দেয়া যায়।

عن أم كرز قالت قالت امرأة من أهل عبد الرحمن بن أبي بكر إن ولدت امرأة عبد الرحمن غلاما نحرنا عنه جزورا فقالت عائشة : لا بل السنة عن الغلام شاتان مكافئتان وعن الجارية شاة يطبخ جدولا ولا يكسر لها عظم فيأكل ويطعم ويتصدق يفعل ذلك في اليوم السابع فإن لم يفعل ففي أربع عشرة فإن لم يفعل ففي إحدى وعشرين

হযরত উম্মে কুরজ বলেন, আব্দুর রহমান বিন আবী বকরের পরিবারের এক মহিলা বলেন, আব্দুর রহমানের স্ত্রী ছেলে সন্তান প্রসব করে, তখন আমরা তার পক্ষ থেকে একটি ভেড়া জবাই করেছি। তখন হযরত আয়শা রাঃ বললেন-এমনটি, বরং পদ্ধতি হল-ছেলের পক্ষ থেকে দু’টি সমান পর্যায়ের বকরী আর মেয়ের পক্ষ থেকে একটি বকরী দিবে [আক্বিকা]।

তারপর এটিকে রান্না করবে, তবে এর হাড্ডিকে ভাঙ্গবে না। তারপর তা নিজে খাবে, অন্যকে খাওয়াবে, এবং দান করবে।

একাজগুলো করবে সপ্তম দিন, সেদিন সক্ষম না হলে চৌদ্দতম দিন, সেদিনও সক্ষম না হলে একুশতম দিন করবে আক্বিকা। [মুসনাদে ইসহাক বিন রাহহুয়া, হাদীস নং-১২৯২}

সন্তান প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে গেলে আক্বিকার প্রয়োজনীয়তা আর বাকি থাকে না। তাই নাবালেগ থাকা অবস্থায় আক্বিকা দেয়াই উচিত।

আক্বিকা দেয়া জরুরী কোন বিষয় নয়, বরং মুস্তাহাব

এখানে একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, উপরে উল্লেখিত সুন্নত পালনের ক্ষেত্রে এখন কিছু ডাক্তার বিভিন্ন কথা বলে অভিভাবকদের নিরুৎসাহিত করে। সেক্ষেত্রে অভিভাবকদের মনে রাখা উচিত আল্লাহর রাসূলের সমস্ত সুন্নত সবসময়েই মানুষের জন্য সর্বোত্তম পন্থা। মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আমার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা আহযাবঃ ২১)

পক্ষান্তরে মানুষের নিজস্ব চিন্তা ভাবনা, গবেষণা এগুলো ভূলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয় বরং সর্বদা পরিবর্তনশীল। সুতরাং কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিদের কথায় প্রভাবিত হয়ে সন্তানদের পবিত্র সুন্নত পালনে বিরত থাকা উচিত হবে না। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।।

ফেসবুকে লাইক দিন