কাশ্মীরে ৮ বছরের মুসলিম শিশুকে মন্দিরে তুলে নিয়ে গণধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা

৮ বছরের শিশু আসিফা বানু’র দেহ পড়ে ছিলো মন্দির সংলগ্ন ঝোপের আড়ালে।  তিনদিন ধরে তাকে দলবেঁধে ধর্ষণের পর গলা টিপে হত্যা করেছিলো দুর্বৃত্তরা। ভারত শাসিত জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যে একটি আট বছরের কন্যা শিশুকে অপহরণ, ধর্ষণ এবং হত্যার যে মামলার তদন্ত করছিল সেই রাজ্যের পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ, তারা আদালতের কাছে চার্জশীট পেশ করেছে। তদন্তে ঘটনার যে বিবরণ উঠে এসেছে, তা এক কথায় বীভৎসতার চূড়ান্ত পর্যায়। কিন্তু তারা স্থানীয় প্রভাবশালী ও হিন্দু ধর্মের অনুসারী হওয়ায় ভারতের কাশ্মীরে তাদেরকে বাঁচাতেই মরিয়া প্রশাসন!

চার্জশীটে এও বলা হয়েছে যে, ইসলাম ধর্মাবলম্বী যাযাবর সম্প্রদায়কে হিন্দু প্রধান এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আর তাদের মনে আতঙ্ক তৈরি করতে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

কাশ্মীরের কাঠুয়া অঞ্চলের যাযাবর মুসলিম বাকারওয়াল গোষ্ঠীর মেয়ে ছিলো ৮ বছরের ছোট্ট আসিফা। কাঠুয়ার উপত্যকায় ঘোড়া চড়ানোর সময় অপহরণ করা হয় তাকে। মন্দিরে আটকে রেখে তিন দিন ধরে একদল হিন্দু পুরুষ ধর্ষণ করে তাকে। পরে মাথায় পাথর মেরে ও গলা টিপে হত্যা করা হয় আসিফাকে।

ঘটনা জানুয়ারির। কিন্তু এখনও মেয়ের হত্যার বিচার পাননি আসিফার বাবা ইউসুফ পুজওয়ালা। কারণ, ধর্ষকদের প্রত্যেকেই হিন্দু এবং স্থানীয় প্রভাবশালী। ইউসুফের ভাষ্যমতে তাদের গোত্রকে ওই এলাকাছাড়া করার উদ্দেশ্যেই খুন করা হয়েছে।

এতদিন আসিফার পরিবারকে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে মামলাই করতে দেয়া হয়নি। সোমবার কাশ্মিরের আদালত প্রাঙ্গনে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন মামলা রুজু করতে আসা পুলিশদের শারীরিকভাবে বাধা দেয় আসামীপক্ষের একদল হিন্দু আইনজীবী।
আইনজীবীদের বক্তব্য, এই মামলা হলে জনগণের ‘অনুভূতি’তে আঘাত দেয়া হবে।

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ফেসবুক এবং টুইটারজুড়ে এখন ‘জাস্টিস ফর আসিফা’ হ্যাশট্যাগের ছড়াছড়ি। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঘটনাটি তুমুল সাড়া ফেলায় শেষ পর্যন্ত পুলিশ গ্রেফতার করেছে ৮ ধর্ষককে। মূল আসামী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সানজি রাম, যিনি পুরো ঘটনার ছক কষেছেন বাখেরওয়াল জনগোষ্ঠীর মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়ার জন্য! অন্যদের মধ্যে রয়েছে তিন পুলিশ কর্মকর্তা এবং এবং তিন কিশোর!

এদিকে কাঠুয়াজুড়ে একদল নারী সোমবার মানববন্ধন করে সড়ক অবরোধ করেন ধর্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেয়ার দাবি জানিয়ে। তারা হুমকি দেন, ধর্ষকেরা মুক্ত না হলে তারা আত্মাহুতি দিবেন! বিক্ষোভরত এই নারীদের বক্তব্য, বাদীপক্ষের আইনজীবীদের কথা বিশ্বাস করা যায় না, কারণ আসিফার মতো তারাও মুসলমান! ওদিকে এই ঘটনার বিভক্তি চলে এসেছে কাশ্মীরের জোট সরকারেও। রাজ্য সরকারের দুই বিজেপি মন্ত্রী চৌধুরী লাল সিং এবং চন্দর প্রকাশ গঙ্গা হিন্দু একতা মঞ্চের আয়োজনে ধর্ষকদের মুক্তির দাবিতে করা সমাবেশে যোগ দেন।

অবশেষে কাশ্মির ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন ধর্ষণের শিকার আসিফা বানুর বাবা-মা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর থেকে এ কথা জানা গেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, পুলিশি তদন্তকে অযথার্থ আখ্যা দিয়ে জম্মু বার এসোসিয়েশন ধর্মঘট ডাকার পর পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে আসিফার পরিবার। টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের শুক্রবারের এক প্রতিবেদনে নিজস্ব অনুসন্ধান সূত্রে জানায়, ভুক্তভোগী শিশু আসিফার বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ পুজওয়ালা তার স্ত্রী, দুই সন্তান ও গবাদিপশু নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে গেছেন।

এর আগে জানা গেছে, পরের মাসে তারা কাশ্মির ছেড়ে যাবেন। জম্মু বার এসোসিয়েশন ও ভিম সিংয়ের জম্মু কাশ্মির প্যানথার পার্টি ‘ধর্ষক ও হত্যাকারীদের’ পক্ষে বনধ ডাকা ও মিছিল করার সময়ও রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশ ‘নীরব দর্শকের ভূমিকা’ পালন করেছে বলে বৃৃহস্পতিবার অভিযোগ করেছে মিরওয়াজ ওমান ফারুকের নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতাকামী হুরিয়াত কনফারেন্স।

অন্যদিকে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি দেখা করেন ভারতের ইউনিয়ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং-এর সঙ্গে। তিনি অভিযোগ করেছেন, এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতৃত্বহীনতার কারণেই রাজ্যে এই সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে আসিফার বাবা-মা সুষ্ঠু বিচার পাবেন কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। – এনডিটিভি, বিবিসি।

ফেসবুকে লাইক দিন