মে মাস থেকেই এলএনজি গ্যাস পাবেন গ্রাহকরা

কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনাল থেকে ২৫ এপ্রিল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ শুরু হবে। তরল থেকে একে ফের গ্যাসে রূপান্তর করে সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে সবমিলিয়ে ১৫ দিনের মতো সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।

সে হিসেবে আগামী মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মাঝামাঝি এলএনজি ব্যবহার করতে পারবেন গ্রাহকরা। প্রথম পর্যায়ে চট্টগ্রামে এই গ্যাস সরবরাহ করা হবে।

প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণ চাপ ও তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। শীতলীকরণ (রেফ্রিজারেশন) প্রযুক্তির মাধ্যমে তাপমাত্রা কমিয়ে মাইনাস ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনলে তা তরলে পরিণত হয়। এই তরল প্রাকৃতিক গ্যাসকেই বলা হয় এলএনজি। একটি জাহাজে করে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার মিলিয়ন বা ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আনা সম্ভব।

দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটাতে, বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চলতি বছর থেকে গ্যাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। বর্তমান ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায়ও এই প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী।

তখন তিনি বলেছিলেন, গ্যাস দেওয়ার আগে এলএনজি আমদানি করা হবে এবং তা রাখার জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মাণ করা হবে একটি টার্মিনাল। বাজেটে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পটিকে দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য বলে বা ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন অর্থমন্ত্রী।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর আওতায় সরকার এই প্রকল্পের অনুমোদন দেয়।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জ্বালানি সংকট দূর করতে দেশে প্রথমবারের মতো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তরল আকারের এই গ্যাস আসবে কাতার থেকে। প্রথমে প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন (৩০ কোটি) ঘনফুট এলএনজি আসবে। পর্যায়ক্রমে সরবরাহ বাড়িয়ে ৫০০ মিলিয়ন (৫০ কোটি) ঘনফুট করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এই এলএনজি আমদানি করবে।

প্রথমবার এক্সিলারেট এনার্জি তাদের রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিটে এক লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার এলএনজি বাংলাদেশে নিয়ে আসবে। এর আগে ২২ বা ২৩ এপ্রিল এই ইউনিট বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘এলএনজির আমদানি বর্তমান সরকারের একটি বড় উদ্যোগ। এতে দেশের গ্যাস ঘাটতি কিছুটা হলেও কমবে। এখন পর্যন্ত যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন হলে আগামী কয়েক বছরেরর মধ্যে দেশে প্রায় ২০০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি হবে। এতে গ্যাসের ঘাটতি যেমন পূরণ হবে, তেমনি গ্যাসের দামও সমন্বয় করতে হবে সরকারকে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এক্সিলারেটের পর বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে এলএনজি আনবে আরও তিনটি কোম্পানি। সামিট, রিলায়েন্স, হংকং সাংহাই মানজালা। প্রত্যেকেই ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস বাংলাদেশ আনবে। এক্সিলারেটের সঙ্গে ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই চুক্তি স্বাক্ষর করে পেট্রোবাংলা। চুক্তি অনুযায়ী, এ মাসেই তাদের এলএনাজি আমদানির কথা ছিল।

২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল সামিটের সঙ্গে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। তাদেরও এ বছরের অক্টোবরে এলএনজি আনার কথা রয়েছে। এছাড়া রিলায়েন্স ও হংকং সাংহাই মানজালার সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এরমধ্যে রিলায়েন্স ২০১৯ সালের জুন মাসে এবং মানজালার ২০২০ সালের জুন মাসে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই এলএনজি সঞ্চালনের কাজও শুরু হয়েছে। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ (জিটিসিএল) জানায়, এরইমধ্যে মহেশখালী–আনোয়ারা-১ নামের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। মহেশখালী থেকে আনোয়ারা (২ নম্বর সঞ্চালন লাইন), আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট, চট্টগ্রাম থেকে ফেনী, ফেনী থেকে বাখরাবাদ এবং কটুম্বপুর থেকে মেঘনাঘাট সঞ্চালন লাইনগুলো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২৬৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। এরপরও শিল্পকারখানায় গ্যাস–সংকট রয়েছে। বর্তমানে শিল্পকারখানায় প্রতি ঘনমিটার (৩৫ দশমিক ৩১৪৭ ঘনফুট) গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ৭ টাকা ৭৬ পয়সা দরে। এলএনজি আমদানি-পরবর্তী প্রতি ঘনমিটারের প্রস্তাবিত মূল্য ধরা হয়েছে ১৪ টাকা ৯০ পয়সা। এতে শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা দেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে এলএনজির দাম সমন্বয় করার দাবি জানিয়েছেন।

ফেসবুকে লাইক দিন