মাযহাব ইসলামকে বিভক্তি করেনি, বরং বিভক্তি থেকে বাঁচিয়েছে: মাওলানা আজহারী

ইমান২৪.কম: মাযহাব নিয়ে মাওলানা মিযানুর রহমান আজহারীর মতামত জানতে চাচ্ছেন অনেকেই। সে বিষয়টিকে ক্লিয়ার করতে মাওলানা আজহারী দীর্ঘ একটি মতামত প্রকাশ করেছেন মাযহাব সম্পর্কে। পাঠকের জন্য নিচে তুলে ধরা হচ্ছে।

‘মাযহাব ইসলামকে বিভক্তি করেনি বরং এটি ইসলামকে অনেক বিভক্তি থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আর মাযহাবের মতভিন্নতার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যতগুলো আমল প্রমাণিত আছে; সবগুলোকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পুরো পৃথিবীতে জারি রেখেছেন।

মাযহাব কী? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলতে পারি, মাযহাব একটি আরবী শব্দ এর অর্থ হলো পথ বা মত কিংবা অভিমত অর্থাৎ ইমামদের গবেষণালব্ধ যে অভিমত সেটাকেই আরবিতে মাযহাব বলে। ইংরেজিতে যেটাকে বলে স্কুল অব থড। সংক্ষেপে বলা যায়, যে পথের গন্তব্য কুরআন এবং সুন্নাহ সেটাকেই মাযহাব বলে। অনেক সময় এমন হয় যে, কুরআন এবং সুন্নাহতে বর্ণিত বিধিবিধানগুলো আমাদের বুঝতে কিংবা সেটা বুঝে আমল করতে সমস্যা হয়ে যায়; সেক্ষেত্রে যদি মাযহাবের যে পদ্ধতি আছে সে পদ্ধতিতে আমরা চলি; তাহলে আমাদের সেটা আমল করতে বা মানতে সহজ হয়ে যায়।

এ আলোচনার পর আমরা বলতে পারি যে, মাযহাব কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোন বিষয় নয় বরং এটি ইসলামের বিধি-বিধানগুলোকে সুবিন্যাস্ত আকারে মানুষের মাঝে তুলে ধরার একটি মাধ্যম। কুরআন এবং সুন্নাহর সবচেয়ে বিশুদ্ধ ব্যাখ্যায় হচ্ছে মাযহাবের ইমামদের সংকলিত থেকে ইসলামি ফিক্হ। আর এই ফিকহ শাস্ত্রের যে স্কুল অব থড সেগুলোকেই বেসিক্যালি মাযহাব বলা হচ্ছে।

প্রসিদ্ধ মাযহাব চারটি। হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী। আমরা জানি কোরআন এবং সুন্নাহতে বিক্ষিপ্তভাবে অনেক নিয়ম-কানুন এবং বিধি-বিধান বর্ণনা করা হয়েছে যা আমাদের সেখান থেকে বোঝা অনেকটাই অসম্ভব। মাযহাব সেগুলোকে আমাদের মাঝে সুবিন্যাস্ত ভাবে তুলে ধরেছে। যেমন ধরুন, নামাজের ফরজ কয়টি? বা নামাজের ওয়াজিব কয়টি? এটি কুরআন সুন্নাহর কোথাও বিন্যস্তভাবে পাওয়া যাবে না। আপনি বের করতে পারবেন না যে, নামাজের সুনির্দিষ্টভাবে ফরজ এতটি বা ওয়াজিব এতটি। কিন্তু মাযহাবের ইমামগণ নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে অনেক গবেষনা করে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো খোঁজার চেষ্টা করেছেন এবং হাজার হাজার মাসআলা ইসতেমবাত করেছেন; যা আমাদের জন্য ইসলামকে মানা এবং ইসলামের বিধি-বিধানগুলোকে বোঝার ক্ষেত্রে অনেকটা সহজ করে দিয়েছে। তাহলে আমরা বলতে পারি কুরআন এবং সুন্নাহর সারনির্যাসই হলো মাযহাব।

এখন প্রশ্ন হতে পারে মাযহাব একাধিক হওয়ার কারণ কি যেহেতু আমরা শুরুতেই বলেছি মাযহাব অর্থ মত বা অভিমত তাই প্রত্যেকের অভিমত একই রকম হবে এটা আসলে লজিক্যাল না। এটা যৌক্তিকও নয়। কেননা একেক জনের চিন্তা একেক রকম। একেকজনের বুঝ একেক রকম। একেকরকম মতের ভিন্নতা বা চিন্তার ভিন্নতা এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। মানবজীবনে এটি একটি কমন বিষয়। এটা মানুষের মাঝে থাকবেই। এটাই মানুষের সহজাত। একারণেই ইসলামের বিভিন্ন বিধানের বিষয়ে কোরআন সুন্নাহ থেকে নির্গত মাযহাবগুলোর ক্ষেত্রে আমরা একাধিক মতামত পেয়ে থাকি।

তাছাড়া নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছ থেকেও একটি আমলের একাধিক পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো নামাজে বুকের উপর হাত বেঁধেছেন। কখনও একটু নিচে হাত বেঁধেছেন। কখনো নাভির সঙ্গে মিলিয়ে একটু নিচে হাত বেঁধেছেন। কখনোবা তিনি নামাজের মধ্যে হাত বাঁধেননি; ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে সাহাবায়ে কেরাম নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীসগুলোর একেকটিকে একেকজন গ্রহণ করেছেন।

যেমন কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরাম বুকের উপর হাত বাধার হাদিসকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরাম নাভির উপরে হাত বাধার হাদিসটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরাম নাভির সংলগ্ন নিচে হাত বাধার হাদিসটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন আবার কোন কোন সাহাবায়ে কেরাম আবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম যে মাঝে মাঝে হাত বাঁধতেন না; সে হাদীসটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যেমনটি আমরা দেখতে পাই মালেকী মাযহাবের ক্ষেত্রে।

এই মতভিন্নতা যে মাযহাবের ইমামদের তৈরি; এমনটি নয়। বরং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগেও কিন্তু আমরা সাহাবায়ে কেরামের মাঝে ফিকহী বিষয়ের মত বিভিন্ন তা দেখতে পাই। যেমন কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরাম নামাজ শুরু করার আগে সুরা ফাতেহার পূর্বে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ জোরে পড়ে তারপরে সূরা ফাতিহা শুরু করতেন। আবার অনেক সাহাবারা সালাতের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ রাহমানির রহিম’ জুড়ে পরতেন না বরং আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন থেকে উনারা জহিরী কেরাত শুরু করতেন। তো আমরা এখানে দেখতে পেলাম, সাহাবায়ে কেরামের যুগেও ফিকহি বিষয়ে একাধিক মতামত পাওয়া যায় পাওয়া যায়।

সাহাবায়ে কেরামের মাঝেও মতভিন্নতা যে ছিল সে বিষয়ে আমরা বুখারীর একটি হাদিস উল্লেখ করতে পারি। ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার সাহাবায়ে কেরামকে সরাসরি নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, কেউ যেনো বনু কুরাইজাতে না পৌছে আসরের সলাত না পড়ে। পরবর্তীতে বনু কুরাইজাতে পৌছানোর পূর্বেই আসরের সলাতের সময় হয়ে গেলে সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্যে জড়িয়ে পড়েন। একদল বলেন আমরা আল্লাহর রসুল যা নির্দেশ করেছেন হুবহু তাই পালন করবো ফলে তারা সূর্য ডুবে যাওয়ার পর বনু-কুরাইজাতে পৌছে সলাত আদায় করেন। অন্য দল বলেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদ্দেশ্য এটা ছিল না বরং তিনি বলতে চেয়েছেন দ্রুত যাও। তাই তারা পথিমধ্যেই আসরের সালাত আদায় করে নেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই ঘটনা বলা হলে তিনি কাউকেই তিরষ্কার করলেন না।’ দেখা যাচ্ছে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা সরাসরি শুনা ও জানার পরও সেটার উদ্দেশ্য ও অর্থ নিয়ে একনিষ্ঠ সাহাবায়ে কিরাম মতপার্থক্যে জড়িয়ে পড়েছেন।

আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর একটি নির্দেশনা একদল সাহাবায়ে কেরাম যেমন বুঝেছেন ঠিক এর উল্টো বুঝেছেন আরেকদল সাহাবায়ে কেরাম এবং এটা আমরা দেখেছি যে, পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরামের দলটি বনু কুরাইজায় পৌঁছার পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এঘটনা শোনালে তিনি কোনো কিছুই বললেন না। তিনি চুপ রইলেন। এ ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, উভয় দলের চিন্তাধারার ভিন্নতা সঠিক ছিল। কেননা এখানে যদি কোন একটি দল বিপথে থাকতো কিংবা কোনো একটি দলের মতভিন্নতা গুনাহের দিকে যেত, ভুল হতো; তাহলে নবী করিম সল্লালাহ সাল্লাম চুপ থাকতেন না। কেননা নবীদের সিফাত হলো, তাঁরা কখনো শরিয়ত বহির্ভূত কোনো কিছু দেখলে চুপ থাকেন না, সঠিক পথের দিশা দেন এবং সঠিক পথ দেখিয়ে দেন।

কোন একটি বিষয়ে একাধিক মতও যে সঠিক হতে পারে বনু কুরাইজার এই ঘটনাটি অনেক বড় একটি প্রমাণ। অর্থাৎ সব বিষয়ে হক একটিই, এমন নাও হতে পারে। একাধিক বিষয়ও সঠিক হতে পারে।

এখানে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মেরাজের ঘটনা আমরা সবাই জানি। জানি যে তিনি মেরাজে গিয়ে আল্লাহ তায়ালাকে স্বচক্ষে দেখেছেন। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেরাজে গিয়ে আল্লাহতালাকে সরাসরি দেখেছেন কিনা এ নিয়ে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে মত ভিন্নতা আমরা দেখতে পাই।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তমা স্ত্রী আমাদের আম্মাজান হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা মনে করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু সালামের আল্লাহ তায়ালাকে সরাসরি চোখে দেখেননি এবং তার সঙ্গে এ মত গ্রহণ করেছেন আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু। আর তাদের এ দাবির সঙ্গে মজবুত দলিলও আছে। অন্যদিকে হযরত আনাস, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা মনে করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মেরাজে গিয়ে আল্লাহতালাকে সরাসরি স্বচক্ষে দেখেছেন।

এখানে আমরা দেখতে পাই প্রত্যেকেই জলিল কদর সাহাবী। কিন্তু কিন্তু উনাদের মাঝে মেরাজের মত এমন প্রসিদ্ধ ঘটনা নিয়েও মত ভিন্নতা রয়েছে। অথচ তারা সবাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাছে পেয়েছিলেন এবং মেরাজের ঘটনা তার কাছ থেকেই শুনেছিলেন।

তাই আমরা আবারও বুঝতে পারলাম, সাহাবায়ে কেরামের মাঝেও মতভিন্নতা ছিল। তাই এ বিষয়টিকে কঠোরভাবে দেখার কিছু নেই। মতভিন্নতা থাকতেই পারে। আমরা দেখতে পেয়েছি যে, সাহাবায়ে কেরামের কাছে যে মতটি মজবুত মনে হয়েছে; সেটি গ্রহণ করেছেন এবং সে বিষয়ের ওপরে আমল করেছেন। আর সময়ের পরম্পরায় সাহাবীদের কাছ থেকে তাবেয়িগণ সে মত গ্রহণ করেছেন এভাবে তাবে-তাবেঈনও গ্রহণ করেছেন। আর কালের পরিবর্তনে আমরা সে মতভিন্নতাগুলো পেয়েছি এবং সেগুলোর ওপর আমল করে করছি। তাই এটিকে নেগেটিভভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

ফেসবুকে লাইক দিন