মানুষের অধঃপতন হয় যে কারণে…

নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা) এর উপর। মহাগ্রন্থ কুর’আন আল কারীমে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ কোন দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”[সূরা লোকমান; ৩১:১৮]

অহংকার পতনের মূল-এই প্রবাদটি মোটামুটি আমাদের সকলের জানা। অহংকার বা অহমিকা মানুষের অধপতনের অন্যতম কারণ। অহংকার বা অহমিকা হলো শয়তানের অন্যতম প্রধান কাজ। যে কারণে শয়তান মুআল্লিমুল মালাইকা’র মতো সম্মানের স্থান থেকে চিরতরে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।

এক আয়াতে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না।তুমিতো কখনোই পদাভরে ভূ-পৃষ্ঠকেবিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমিকখনো পর্বত প্রমাণ হতে পারবে না।” [সূরা বানী ইসরাইল, ১৭:৩৭]

বিতাড়িত শয়তান মানুষের মনে যে মন্দ প্ররোচনা দেয় তার মধ্যে অন্যতম হলো অহংকারবোধকে জাগ্রত করে তোলা। কারণ আত্মার ব্যধিসমূহের মধ্যে অন্যতম ব্যধি হলো অহংকার। নিজেকে অন্যের তুলনায় বড় মনে করা বা অন্যকে তুচ্ছ বা নিকৃষ্ট মনে করাই হলো অহংকারের প্রবেশপথ।

আল্লাহ তাআলার সামনে সর্ব প্রথম এই মানসিকতা প্রদান করেই শয়তান চিরতরে আল্লাহ তাআলার রহমত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা অহংকারের কারণেই শয়তানকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিলেন। শয়তান অহংকারবসত যা বলেছিলোঃ কুরআনে এসেছে-

‘আমি তার (আদম) অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ; তুমি আমাকে অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি করেছো এবং তাকে কাদা মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছো।’ (সুরা আরাফ : আয়াত ১২)

শয়তানের এ দৃষ্টতাপূর্ণ উক্তির পর আল্লাহ তাআলা সঙ্গে সঙ্গে বললেন- “তুমি এ স্থান থেকে নেমে যাও; এখানে থেকে অহংকার করবে তা হতে পারে না। সুতরাং বের হয়ে যাও। তুমি অধমদের অন্তর্ভূক্ত।” (সুরা আরাফ : আয়াত ১৩)

নিজের মধ্যে অহংকার বুঝব কীভাবেঃ প্রথমত প্রকৃত হক বা সত্যকে কেউ ইচ্ছা করে কবুল করতে না পারলে বুঝতে হবে অহংকার তাঁকে বাধা দিচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন কুর’আন আল কারীমে প্রিয় নবী (সা) এর মাধ্যমে যে সত্য আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন তা বিনয়ের সাথে গ্রহন করা এবং মেনে চলা আমাদের জন্য ফরজ। আর যারাই কিনা অহংবোধ আর দাম্ভিকতার কারনে আল্লাহ্‌ এবং তার রাসূল (সা) এর বাণী ও বিধানে বিশ্বাস স্থাপনে অপারগতা প্রকাশ করে এবং তা মেনে চলতে অনীহা প্রকাশ করে তারাই হল কাফির বা অবিশ্বাসী। তাদের ঠিকানা হল জাহান্নাম, যেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে। কারন, নবী-রাসূলদের মাধ্যমে তাদের কাছে যখন সুস্পষ্ট প্রমানসহ সত্য (কুর’আন ও আসমানী কিতাবসমূহ) পাঠানো হয়েছিল, তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছিল; অহংবোধ ও দাম্ভিকতা তাদেরকে সত্য গ্রহন করা থেকে বিরত রেখেছিল।

কুর’আন আল কারীমে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ “যখন তার নিকট আমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হয়, তখনসে দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যেনসে এটা শুনতেই পায়নি, যেন তার কর্ণদুটি বধির। অতএব, তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিয়ে দাও।”[সূরা লোকমান; ৩১:৭]

অন্য এক আয়াতে বলেনঃ “যারা নিজেদের নিকট কোন দলীল না থাকলেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাদের আছে শুধু অহংকার, যা সফল হবার নয়। অতএব,আল্লাহর শরণাপন্ন হও; তিনিতো সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আল-মু’মিন; ৪০:৫৬]
দ্বিতীয় হচ্ছে, মানুষদের প্রতি অবজ্ঞা, অবহেলা, তুচ্ছজ্ঞান। মানুষদের প্রতি দুর্ব্যবহার করা, ছোট করার চেষ্টা করা। যদি এটি কোনো লোকের বক্তব্য বা আচরণের মাধ্যমে অথবা কোনো ইঙ্গিতের মাধ্যমে, কোনো লেনদেনের মাধ্যমে বোঝা যায়, তাহলে বুঝতে হবে তাঁর মধ্যে অহংকার রয়েছে। সেটা আপনার মধ্যে থাকলে আপনিই সেটা বুঝতে পারবেন।

অহংকারের ব্যাপারে কুর’আন আল কারীমে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ(অহংকারবশে) তুমি মানুষ হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না এবং পৃথিবীতেউদ্ধতভাবে বিচরণ করো না; কারণ আল্লাহ্ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।” [সূরা লোকমান, ৩১:১৮]

সহীহ্‌ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদিসে প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা) বলেছেনঃ “একজন মুসলিমের জন্য এটা অনেক বড় একটি গুনাহের কাজ যদি সে তার অপর এক মুসলিম ভাইকে অশ্রদ্ধা/অবজ্ঞার চোখে দেখে।” [সহীহ্‌ মুসলিম; অধ্যায়ঃ ৩২, হাদীস নম্বরঃ ৬২১৯]

অহংকারের কুফলঃ অহংকারের কুফল অনেক বেশি। অহংকার মানুষকে তার কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক। অহংকারের চূড়ান্তরূপ হলো এমন যে, তা অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করা বা অন্যের সহযোগিতা লাভের মানসিকতাকে পর্যন্ত বিনষ্ট করে। অন্যের অধিকারের প্রতি হস্তক্ষেপ করে। কল্যাণের পথ বন্ধ করে দেয়।

মানুষের সঙ্গে ওঠা-বসা, চলা-ফেরা, পাহানাহার ও কথাবার্তাকে নিজের মর্যাদার খেলাপ মনে করে। যখন মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তখন তার কামনা হয় এমন যে, ‘মানুষ তাকে সম্মান করবে।’ কিন্তু আল্লাহ তাআলা দাম্ভিক, অহংকারীকে অপছন্দের বিষয়টি কুরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন-

‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কোনো উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সুরা লোকমান : আয়াত ১৮)

আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার মানুষকে অহংকারমুক্ত থাকতে বলেছেন। হাদিসে কুদসীতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করে বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

‘বড়ত্ব আমার চাদর এবং মহানত্ব আমার ইযার (লুঙ্গি)। কেউ যদি এ দু’টির কোনো একটির ব্যাপারে আমার সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হয় তবে আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।’ (মুসলিম, মিশকাত)

পরিশেষে
অহংকার যে পতনের মূল কারণ; সে প্রমাণ রয়েছে আল্লাহর কালাম ও প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসে।

অহংকারীর ঠিকানা হল জাহান্নাম। আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ সুতরাং,তোমরা দ্বারগুলি দিয়ে জাহান্নামে প্রবেশ কর, সেখানে স্থায়ী হবার জন্যেদেখ অহংকারীদের আবাসস্থল কত নিকৃষ্ট। ”[সূরা নাহল; ১৬:২৯]

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেছেন- ‘যার অন্তরে এক যাররা (অণু) পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (মুসলিম, মিশকাত)

উপর্যুক্ত আলোচনা দ্বারা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট যে, অহংকার একটি মারাত্মক গুনাহ। যার শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ। তাই তা পরিহার করে বিনয়ী হওয়া অত্যন্ত জরুরী। বিনয় মানুষের ভাব-মর্যাদাকে বৃদ্ধি করে, পক্ষান্তরে অহংকার মানুষের মর্যাদাকে বিনষ্ট করে। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে অহংকার, দাম্ভিকতা ও অহমিকা থেকে মুক্ত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ফেসবুকে লাইক দিন