বাংলাদেশের যে গ্রামের প্রতিটি ঘরে মজুদ ভরি ভরি গহনা

ইমান২৪.কম: গ্রামে ঢুকতেই কানে এলো হাতুড়ির ঠুকঠাক শব্দ। বিভিন্ন বাড়ি বা দোকান ঘরে চোখ রাখতেই চোখে পড়লো আগুনের ফুলকি উঠছে। বাড়ির উঠোন, দরজা, ঘরের ভেতরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অলঙ্কার তৈরির সরঞ্জাম।

ঠিকই ধরেছেন, চলছে গহনা তৈরির বিশাল কর্মযজ্ঞ। রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী বুড়িগঙ্গা তীরের এক গ্রামীণ জনপদ ভাকুর্তা। সাভার উপজেলার ইউনিয়ন এটি। গহনা তৈরিই এখানকার প্রধান পেশা। গহনা শিল্প এসে একদম আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে এই জনপদের। ছেলে-বুড়ো, মা-মেয়ে সবাই ব্যস্ত গলার হার, হাতের চুড়ি, কানের দুল, ঝুমকা, চেন, পায়েল ও নূপুর তৈরিতে। রাস্তার পাশে, বাজারে বাজারে গড়ে উঠেছে গহনার কারখানা ও দোকান।

এখানের সবাই গহনা তৈরির পেশায় নিয়োজিত। এই পেশায় থেকে অনেকেই সংসারে ফিরে এনেছে স্বচ্ছলতা। ভাকুর্তা’য় প্রত্যেকটি ঘরের সামনে বা ভেতরে গয়না তৈরির সরঞ্জাম রয়েছে। উজ্জ্বল আলোর ফুলকি ছড়িয়ে কারিগররা সকাল সন্ধ্যা এখানে গলার হার, হাতের চুড়ি, কানের দুল, ঝুমকা, চেন, পায়েল ও নূপুর তৈরিতে কাজ করে যায়। এই গহনা তৈরি করে যেমন অন্যকে সাজতে সহায়তা করছেন তারা, তেমনি একে অবলম্বন করে নিজেদের জীবনকেও সাজাচ্ছেন এখানকার মানুষ।

শুধু ভাকুর্তাই নয়, এ ইউনিয়নের ২৭টি গ্রামের মধ্যে ১৬টিতেই ঘরে ঘরে তৈরি হয় গহনা। এর মধ্যে অন্যতম হলো চুনারচর, ডোমরাকান্দা, সোলারমার্কেট, খাগুড়িয়া, নলাগুড়িয়া, মোগরাকান্দা, চাপরা, কান্দিভাকুর্তা, হিন্দুভাকুর্তা, বাহেরচর, মুশরিখোলা, ঝাউচর ও চাইরা। এসব গ্রামের প্রায় প্রত্যেকটি পরিবারের কেউ না কেউ এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বছরে গড়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকার গয়না তৈরি করা হয়। ভাকুর্তা ইউনিয়নে প্রায় হাজার পাঁচেক গহনার কারিগর রয়েছে।

এসব কারিগর সারাদিন রাত বিভিন্ন ধরণ ও নকশার গহনা তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন। এখানে দেশি সাধারণ নকশার গহনার পাশাপাশি বিদেশের বিভিন্ন ধরনের নকশাদার গহনাও পাওয়া যায়। সাধারণ গহনার দোকানের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহি দোকান ঘর যেমন আড়ং, অঞ্জনস বা কে-ক্রাফ্‌টও এখান থেকে তাদের গহনা সংগ্রহ করে থাকেন বলে জানা যায়। ভাকুর্তার গল্প বেশ পুরনো। এখানকার কারিগররা প্রায় ৩০০ বছর ধরে গহনা তৈরি করে আসছে। নবাবী আমলের শেষের দিকে ও ব্রিটিশ শাসনামলের শুরুর দিকে অনেক কারিগর নাকি জীবন বাঁচানোর জন্য কলকাতা থেকে নানা জায়গায় চলে যায়। এরপর বেশ সময় পার হয়ে যায়। ১৯৮০ সালের দিকে কারিগররা স্থায়ীভাবে ভাকুর্তায় গহনা তৈরির কাজ শুরু করেন।

তখন সোনা ও রূপার গয়না তৈরি হতো। ১৯৯০ সালের দিকে স্বর্ণের চাহিদা পড়ে যাওয়ায় লোকসানে পড়তে হয় তাদের। কিন্তু তারা থেমে থাকেননি, তামা ও পিতলের গহনার দিকে ঝুঁকে পড়েন কারিগররা। নব্বইয়ের দশকে ইমিটেশন গহনা তৈরি হতে থাকে। অবশ্য তখনকার বাজারেও তামা ও পিতলের গয়নার চাহিদা ছিল চোখে পড়ার মতো। ভাকুর্তায় গ্রামের নামেই রয়েছে একটি বাজার। এখান থেকেই গহনাগুলো বিক্রি হয়ে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

এই গ্রামের গয়না ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও রফতানি হচ্ছে। কাঁচা আধা পাকা টিনের ঘরে গয়না সাজিয়ে বসে থাকে বিভিন্ন বয়সের কারিগরেরা। পাইকার দরে বিক্রি হওয়া এসব গয়নার দাম শপিং মলগুলোর চেয়ে কয়েকগুণ কম। দাম ও ডিজাইনের আকারের উপর নির্ভর করে দাম। সেখানকার আমেনা জুয়েলারি ওয়ার্কশপের মালিক মো. সাদেক মিয়া জানান, তাদের তৈরি গয়নাগুলো পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয় ২০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকায়।

ডিজাইন ও আকারের ওপর নির্ভর করে দাম। যেমন নেকলেস ১০০ থেকে ১ হাজার টাকায়, চুড়ি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা জোড়া, সীতাহার ৬০০ থেকে ১১০০ টাকা, নূপুর ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, শাড়ির মালা ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা, নাকের ফুল ২০ থেকে ৩৫ টাকা, টিকলি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। ভাকুর্তা বাজারের কারিগর বেচারাম দেওরি জানান, গহনা তৈরির কাঁচামাল তামা কিনে নিয়ে আসা হয় ঢাকার কোতোয়ালি থানার তাঁতীবাজার থেকে। তাঁতিবাজারের ব্যবসায়ীরা এসব কাঁচামাল আবার আমদানি করেন ভারত থেকে। প্রাথমিকভাবে তৈরি গয়না গুলো অপরিশোধিত অবস্থায় থাকে। এখান থেকে পাইকাররা কিনে নিয়ে পরিশোধন ও রঙ করে বাজারে বিক্রি করে থাকেন।

ফেসবুকে লাইক দিন