বন্ধুরা ব্যস্ত অনলাইন ক্লাসে, রাশেদ ছুটছেন কোদাল নিয়ে

ইমান২৪.কম: কোমলমতি হাতে এখন বই-খাতা আর কলম নিয়ে চিন্তা ভাবনায় থাকার কথা। এবং সহপাঠীদের সঙ্গে আনন্দ উল্লাসে দিন কাটানোর কথা। কিন্তু সেই হাতে ধরতে হয়েছে মায়ের চিকিৎসার খরচ ও সংসারের হাল। জীবন-জীবিকার তাগিদে লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসারে জোগান দিচ্ছে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র রাশেদ হাসান (১৪)। রাশেদ হাসান দি পারফেক্ট আইডিয়াল পাবলিক স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।

বাবা হাফিজার রহমান মারা গেছেন ৮ বছর আগে। পেশায় তিনি ছিলেন একজন ট্রাক ড্রাইভার। বাবা, মা, দুই নিয়ে চার সদস্যের পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন বাবা। এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান ট্রাক ড্রাইভার হাফিজার রহমান। এরপর থেকে রাশেদের মা নাছিমার মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। ৬ বছরের সন্তান রাশেদ ও দুই বছরের শাওনকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে চলতো তাদের জীবন।

গত এক বছর হয়ে যায় মা অসুস্থ হয়ে পরে। পরিবার ও নিজের হাত খরচের জন্য সামান্য আর্থিক চাহিদা পূরণ করতে তিনি লেখাপড়ার পাশাপামি ছুটির দিনে রাজমিস্ত্রির কাজ হাতে তুলে নিয়েছেন। করোনায় স্কুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মায়ের ঔষধ ও সংসারের যোগান দিতে রাজমিস্ত্রির কাজ করেও হিমশিম খাচ্ছে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থী রাশেদ।

রাশেদ হাসান বগুড়ার শেরপুর উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের আন্দিকুমড়া গ্রামের মৃত হাফিজর ড্রাইভারের ছেলে। রাশেদ হাসান বলেন- করোনায় স্কুল বন্ধ কাজও কম। কি করব, পড়াশোনা ও নেই। আমার বন্ধুরা মোবাইলে অনলাইন ক্লাস করলেও কেন হাতে কোদাল আর কাঁধে ভার নিয়ে ছুটছো কেন ? জবাবে রাশেদ হাসান বলেন- একদিকে সামনে ঈদ ছোটভাইকে আছে, মায়ের চিকিৎসার খচর এছাড়াও সংসার খরচতো আছেই। ঠিকমত কাজও পাওয়া যায়না। খুব কষ্টে দিনকাটছে।

তাই যদি আমাকে একটু সাহায্য করে আমার উপকার হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে শিশু শ্রম বাড়ার পাশাপাশি স্কুল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। স্থানীয় রাজমিস্ত্রির হেট বেলালের কাছ থেকে জানা যায়, আমাদের মতো গরিব মানুষর ছেলেরা বেশি ভাগ সংসারের হাল করতে নিরুপায়। তাই এমন কাজে করতে বাধ্য হয় তারা। কিন্তু রাশেদ হাসানের যদিও একটু ভিন্ন। সে শিশু হয়েও সংসারের হাল ধরতে নিরুপায় অল্প বয়সে বাবা মারা গেছে সংসারের হাল ধরেছিল মা, সেই মা আজ অসুস্থ। ছোট ছেলেটি সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।

শেরপুর সরকারি ডিজে মডেল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আকতার উদ্দিন জানান, এ সময়টা করোনাকালীন সময়। শিক্ষার্থী ওরা ঘরবন্ধি। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় পড়াশোনার প্রতি তাদের কোন আগ্রহ নেই। এতে করে শিক্ষার্থী আরও অকালে ঝড়ে পড়ছে। অনলাইন ক্লাসের নামে ক্ষুদে ছাত্ররা মোবাইলে নানা ধরণের গেমসে আসক্ত হচ্ছেন। এছাড়া এমন অনেক হতদরিদ্র পরিবার আছে, যেখানে শিশু শিক্ষার্থীরা সংসারের খরচ চালাতে রাজমিস্ত্রির কাজ, ভাড়ায় ভ্যানগাড়ি, অটোভ্যান চালিয়ে বা অন্যান্য কাজকর্ম করে সংসারের হাল ধরে থাকেন।

শুধু রাশেদ হাসান নয়। তার মতো নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা করোনাকালে পড়াশোনা থেকে দূরে গিয়ে পরিবারের অর্থের যোগান দিচ্ছেন নানা ধরণের কাজ করে। উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের কেল্লা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাজাহান আলী বলেন, ‘করোনায় স্কুল বন্ধ আমার প্রতিষ্ঠানটি প্রান্তিক এলাকায় হওয়ায় বেশীর ভাগ শিশুই হতদরিদ্র পরিবার থেকে এসেছে।

রাস্তা-ঘাটে আমার স্কুলের অনেক শিক্ষার্থীকেই দেখি ব্যাটারিচালিত ভ্যান গাড়িতে যাত্রী কিংবা মালামাল পরিবহন করছে। এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নজমুল হক জানান- বিষয়টি দুঃখজনক, করোনাকালে স্কুল বন্ধ থাকার কারণে ও পারিবারিক অসচ্ছলতায় অনেক শিশুকেই আজকাল বিভিন্ন ধরনের কাজে জরিয়ে পড়ছে।

ফেসবুকে লাইক দিন