বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্যকে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিব এমন কোন বক্তব্য দেইনি: মাওলানা মামুনুল হক

ইমান২৪.কম: নিজের ওপর উঠা বিভিন্ন অভিযোগের জবাব ও আদর্শিক আবস্থান পরিষ্কার করতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক। রবিবার (২৯ নভেম্বর) রাজধানীর পুরানা পল্টনস্থ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে আপনি বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্যকে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিবেন বলেছেন, আপনার এধরণের কোন প্লান আছে কিনা’-এমন প্রশ্নের উত্তরে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্যকে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিব এমন কোন বক্তব্য আমি দেইনি। আমি বলেছি আমাদের যদি কখনো আইনি, নৈতিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সামর্থ্য হয় তাহলে সব ভাস্কর্যই এই জনপদ থেকে অপসারণ করার উদ্যোগ নিব।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাস্কর্য স্থাপনের চেষ্টা করা হলে সামর্থ্যের মধ্যে এর বিরুদ্ধে আমরা বলেই যাব। তবে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে জড়াব না। এমন কোনো পদক্ষেপ নেব না যেটা হঠকারী, দেশের আইন-শৃঙ্খলা বা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে।

লিখিত বক্তব্যে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ঢাকার ধোলাইপাড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের ইস্যুতে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গন। স্বাভাবিকভাবেই ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ কিংবা প্রাণীর ভাস্কর্য নির্মাণ অনৈসলামিক সংস্কৃতি হওয়ায় আলেমসমাজ এর প্রতিবাদ করছে। সেই সূত্রে আমিও ভাস্কর্য তথা মূর্তি নির্মাণের বিরুদ্ধাচারণ করে আমার বক্তব্য তুলে ধরেছি। কিন্তু সুকৌশলে একটি মহল ভাস্কর্য নির্মাণের এই বিরোধিতাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরোধিতা বলে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে আমার বক্তব্য দ্ব্যর্থহীন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে একজন মরহুম মুসলিম নেতা হিসেবে পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা করি এবং তার রুহের মাগফেরাত কামনা করি। কখনো কোনভাবেই এমন একজন প্রয়াত মরহুম জাতীয় নেতার বিরুদ্ধাচারণ করি না এবং করাকে সমীচীনও মনে করি না। আবারো স্পষ্ট করে বলছি আমাদের বক্তব্য ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে, কোনোভাবেই বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে নয়।

আপনাদের রাজনৈতিক আদর্শ থাকা সত্তেও আপনাকে জামায়াত ঘেষা কেন বলা হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার মনে হয় বাংলাদেশে বর্তমানে এটি একটি কৌশল। কাউকে যদি ঘায়েল করতে হয়, হয় তাকে জঙ্গিবাদের অপবাদ দেওয়া হয়, না হয় জামায়াত শিবিরের ট্যাগ লাগানো হয়। বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকেও এই ট্যাগ লাগিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, আমাদের সাথে জামায়াতের মূল বিরোধ আকিদা জায়গায় এবং এটি পরম্পরায়। শাইখুল হাদিস আজিজুল হক রহ. এই চিন্তার বিরুদ্ধে আকিদাগত জায়গায় তার বক্তব্য ও লিখনীতে স্পষ্ট করেছেন। আমরা বরাবরই সে চিন্তা লালনকারী। কাজেই স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য থাকার পরও আমাদের বিরুদ্ধে জামায়াত সম্পৃক্তের এই অপপ্রচার সুপরিকল্পিত বলে মনে করি।

‘ভাষ্কর্যের বিরুদ্ধে অনেকেই কথা বলেছেন। কিন্তু আপনিই প্রধান চরিত্র হলেন কেন’- এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও হেফাজতের এই নেতা বলেন, ভাষ্কর্যের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র রাজনৈতিক অবস্থান থেকে নয়, ধর্মীয় অবস্থান থেকেও কথা বলেছি। সারা পৃথিবীতে ধর্মীয় যতগুলো স্কুল অব থট রয়েছে, ভাস্কর্যের পক্ষে কোনো কথা বলার অবকাশ নেই। এ জন্য সবাই ভাস্কর্য-মূর্তির বিরুদ্ধে কথা বলছে এবং বলবে। সেই জায়গা থেকে আমিও বলছি। এখানে অন্য সবাইকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র আমাকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে সাব্যস্ত করে এবং কথার বিকৃতি ঘটিয়ে, মূল বক্তব্যকে পাশ কাটিয়ে, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে সরকারদলীয় অঙ্গসংগঠনগুলোকে আমার বিরুদ্ধে ময়দানে নামিয়ে দেওয়ার অশুভ অপতৎপরতা লক্ষ্য করছি। এটি ষড়যন্ত্রের কারণেই করা হচ্ছে।

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ইসলামের বিজয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশ জাতি ও মানবতার কল্যাণ সাধনই আমার রাজনৈতিক লক্ষ্য। আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও দর্শন আছে। করো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য রাজনীতি করি না। আমরা আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ বাস্তবায়ন এবং দেশ-জাতির কল্যানে রাজনীতি করি। কুরআন সুন্নাহর আলোকে পূর্বসূরীদের অনুসৃত পথে স্বচ্ছ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা চালানোই আমার ব্রত। কোনো ষড়যন্ত্র অথবা গোপন আঁতাতের মাধ্যমে দেশ রাষ্ট্র কিংবা সরকারবিরোধী কোনো কর্মসূচী আমাদের নেই। অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জোটবদ্ধভাবে রাজনীতিতে ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে আমাদের সংগঠন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো রাজনৈতিক জোটে যুক্ত নই। আমাদের এমন স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান থাকা সত্বেও লক্ষ করছি একটি মহল ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমি ব্যক্তি মামুনুল হককে সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার পায়তারা চালাচ্ছে। আর এ জন্য জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অমূলক ও কল্পিত অভিযোগ আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমি এই ষড়যন্ত্রের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি।

সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মাওলানা কোরবান আলী কাসেমী, অফিস ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলনা আজিজুর রহমান হেলাল, বায়তুলমাল সম্পাদক মাওলানা মাহবুবুল হক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মাওলানা হারুনুর রশীদ ভূঁইয়া, সহপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মদ ফয়সাল, যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি পরিষদ সদস্য মাওলানা আবুল হাসানাত জালালী, মহানগর সভাপতি মাওলানা রুহুল আমীন খান, সহ-সভাপতি মুফতি নূর মোহাম্মদ আজিজী, মাওলানা ইলিয়াস হামিদী, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুল মুমিন, সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ছানাউল্লাহ, মাওলানা আতিক উল্লাহ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা এহসানুল হক ও ছাত্র মজলিসের সেক্রেটারী জেনারেল মুহাম্মদ উবায়দুর রহমান প্রমূখ।

ফেসবুকে লাইক দিন