ফিলিস্তিনে প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে মৃত্যু, বিশ্ব মোড়লদের টনক নড়ছে

ইমান২৪.কম: অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় টানা পঞ্চম দিনের মতো বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। সীমান্ত এলাকা থেকে গাজায় আর্টিলারি শেল নিক্ষেপও শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত গাজায় ১২২ জন নিহত হয়েছে।

তাদের মধ্যে ৩১ শিশু ও অনেক নারী রয়েছেন। গেল সোমবার (১০ মে) ইসরায়েলি আক্রমণ শুরুর পর থেকে সেখানে আহত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৯০০ জনে। আহতদের চিকিৎসা দিতে সেখানকার হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। কারণ করোনা রোগীর চাপে হাসপাতালগুলো আগে থেকেই নাজেহাল অবস্থায় ছিল। ইসরায়েলের নিক্ষেপ করা আর্টিলারি শেল দায়ির আল-বালাহ ও মাগাজির পূর্বাঞ্চলের বেসামরিক লোকজনের বাড়িঘরের ওপর পড়ছে। প্রাণ বাঁচাতে গাজার উত্তরাঞ্চলে জাতিসংঘ পরিচালিত স্কুলগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে ফিলিস্তিনিদের শত শত পরিবার।

শুক্রবার ভোরে ইসরায়েলের আশকেলন শহরে রকেট হামলা চালিয়েছে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস। ইসরায়েল জানিয়েছে, হামাসের হামলায় এখন পর্যন্ত এক সৈন্যসহ মোট ৭ ইসরায়েলি ও একজন ভারতীয় নিহত হয়েছে। তাছাড়া দক্ষিণ লেবাননের একটি এলাকা থেকে ইসরায়েলে অন্তত ৩টি রকেট নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় রামুন বিমানবন্দরে ‘আইয়াশ-২৫০’ নামের ‘দূরপাল্লার’ রকেট হামলাও চালিয়েছে হামাস।

হামাসের সামরিক শাখা ইজ্যাদ্দিন কাসসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র আবু ওবায়দা বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনের গাজা থেকে ২২০ কিলোমিটার দূরে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলের রামুন বিমানবন্দরে রকেট হামলা চালানো হয়েছে। এটি ২৫০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করতে সক্ষম।’ ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটিতে ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ও সিনাগগে আগুন দেয় ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীরা।

কোথাও কোথাও ফিলিস্তিনিদের দোকান-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতারেসসহ আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলো অনতিবিলম্বে এই সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানালেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাতে সাড়া দেননি। নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘ইসরায়েলে শান্তি পুনরুদ্ধারের জন্য যতদিন প্রয়োজন, ততদিন হামলা অব্যাহত থাকবে।’ সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দৃঢ়ভাবে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। এক টুইট বার্তায় ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। আমি যুদ্ধবিরতি ও সংলাপের জন্য দৃঢ়ভাবে আহ্বান জানাই। আমি শান্ত অবস্থা ও শান্তির জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।’

ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা বন্ধের বিষয়ে আগামী রবিবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে কূটনীতিকরা জানিয়েছেন। জানা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির কারণে আজ শুক্রবার নির্ধারিত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকটি আয়োজনে সম্মতি জানিয়ে পরবর্তী সপ্তাহের শুরুতে করার প্রস্তাব দেয়। তিউনিসিয়া, নরওয়ে ও চীনের অনুরোধে আয়োজিত এই বৈঠকটি রবিবার অনুষ্ঠিত হবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন শুক্রবারের অধিবেশন পিছিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকে বাধা দিচ্ছে না, তবে বৈঠকের জন্য সময় প্রয়োজন। আমরা জাতিসংঘে উন্মুক্ত ও ফলপ্রসূ আলোচনায় সমর্থন করছি।’ সংঘর্ষ ও সহিংসতা বাড়তে থাকায় ইসরায়েলের প্রধান বিমানবন্দর বেন গুরিওন।

সেখানকার সব ফ্লাইট রামন বিমানবন্দরে সরিয়ে নিয়েছিল ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বৃহস্পতিবার ওই বিমানবন্দরেও আঘাত হেনেছে ফিলিস্তিনিদের ছুড়া রকেট। ক্রমবর্ধমান এই হামলা-পাল্টা হামলার জেরে তেল আবিবের সঙ্গে সব ফ্লাইট বাতিল করেছে ইউরোপীয় এয়ারলাইনগুলো। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজের ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ভার্জিন আটলান্টিক, জার্মানির লুফথানসা, স্পেনের আইবেরিয়া, ডেল্টা এয়ারলাইনস, আমেরিকান এয়ারলাইনস ও ইউনাইটেড এয়ারলাইনস। ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলিদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের ৭ সপ্তাহের যুদ্ধের পর এবারই সবচেয়ে বড় ধরনের সংঘাত চলছে।

ইসরায়েল অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জারাহ এলাকায় থেকে বেশ কয়েকটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাস্তুচ্যুত হওয়ার শঙ্কা থেকে এবারের সংঘাতের সূত্রপাত। এই ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো যেখানে বসবাস করছে তার প্রকৃত মালিক ইহুদিরা, গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের পক্ষের বেশ কয়েকটি সংগঠনের এমনই দাবি। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা এ ঘটনাকে জেরুজালেম থেকে তাদের বাস্তুচ্যুত করার ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে দেখছে। এ নিয়েই এপ্রিলের শেষ দিকে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ, ইসরায়েলিদের বসতি স্থাপনকারী ও পুলিশের সঙ্গে তাদের ছোটখাটো সংঘর্ষ হতে থাকে।

ফেসবুকে লাইক দিন