পানিতে ডুবে ৬ শিশুর মৃত্যু, বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত বহু এলাকা

ইমান২৪.কম: ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও পূর্ণিমার প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদীর পানি বেড়ে গেছে। আর এর প্রভাবে সৃষ্ট জোয়ারে বেড়িবাঁধ ভেঙে বেশ কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ সময় পৃথক স্থানে পানিতে ডুবে প্রাণ গেছে ৬ শিশুর। ভোলা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, বরগুনার নিচু এলাকা ও চরাঞ্চলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অনেক মানুষ। ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ আরও দুর্বল হয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের চারটি সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় জোয়ারের পানি আরও বাড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। আজ বৃহস্পতিবার (২৭ মে) সকালে আবহাওয়ার এক সতর্কবার্তায় আবহাওয়া অধিদফতর এ তথ্য জানিয়েছে।

এর আগে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস’র প্রভাবে বাঁধ ভেঙে খুলনায় ৬০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের ছয় হাজার বাসিন্দা আশ্রয় নিয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। আজ বৃহস্পতিবার (২৭ মে) সকালে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিমেষ বিশ্বাস গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ উপজেলার ৬০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

এর আগে বুধবার (২৬ মে) নদী উত্তাল হয়ে উঠলে বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত হলে বুধবার রাত থেকে মানুষ বাড়ি-ঘর ছেড়ে আশ্রয় নেন আশ্রয়কেন্দ্রে। গতকাল সকাল ১০টায় খুলনায় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টা ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার। মাঝে মধ্যে বাতাসের গতিবেগ আরও বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (সকাল ৯টা পর্যন্ত) বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২০ মিলিমিটার। নদীতে জোয়ার না থাকায় এখনও বেড়িবাঁধে পানির চাপ তৈরি হয়নি। তবে বেলা ১১টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ভরা জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ থেকে ৬ ফুট অধিক উচ্চতায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশংকা রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় থেকেও জোয়ারের সময় জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ টিকিয়ে রাখাই এখন উপকূলে বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে, মঙ্গলবার রাতে জোয়ারের সময় খুলনার কয়রার ঘাটাখালি, মহারাজপুর, দক্ষিণ বেতকাশি ও মহেশ্বরীপুরে বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। বুধবার সকাল থেকে ১০টি পয়েন্টে মাটি দিয়ে বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করছেন এলাকাবাসী। কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ হোসেন জানান, মূল ভয়টা হচ্ছে বুধবার দুপুরে ভরা জোয়ারের সময় অতিরিক্ত পানির চাপ বাড়লে বাঁধ টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হবে। তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাতের জোয়ারে দুই-তিন ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়ে মহারাজপুর মঠবাড়ি, দক্ষিণ বেতকাশির আংটিহারা ও মাটিভাঙ্গা পয়েন্টে বাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। বৈরি আবহাওয়ায় বাতাসের গতিবেগ ও জোয়ারের পানি বৃদ্ধিতে জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধে চাপ বাড়ছে।

পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী জানান, মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে পাইকগাছার দেলুটি চকরি বকরি, কপিলমুনি সিলেমানপুর ও গড়ইখালি খুতখালি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। এর মধ্যে গত সপ্তাহে দুই লাখ টাকা ব্যয়ে সিলেমানপুর পয়েন্টে বাঁধ মেরামত করা হয়েছিল। কিন্তু রাতের জোয়ারে পানি অতিরিক্ত চাপে তা আবারও ভেঙে গেছে। তিনি বলেন, সোলাদানা ইউনিয়নের নারকেলতলা, বরইতলাসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভরা জোয়ারের সময় আবারও জলোচ্ছ্বাস তৈরি হলে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে। মাইংকিং করে এলাকাবাসীকে সতর্ক করা হচ্ছে। দাকোপে কামিনীবাসিয়া, মোজামনগর, গৌর কাঠি, মৌখালি পিচের মাথা, পানখালি পুরাতন খেয়াঘাট, জাবেরের খেয়াঘাট ও খলিসা পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের সহায়তায় ঝুঁকিপূর্ণ ৯টি পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে মেরামত কাজ করা হচ্ছে।

খুলনা আবহাওয়া অফিসের প্রধান কর্মকর্তা মো. আমিরুল আজাদ জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে। মাঝে মধ্যে মাঝারি আকারের বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সেই সাথে ঝড়ো বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার হতে পারে বলে জানান তিনি।

দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিন্টু বিশ্বাস বলেন, ঘূর্ণিঝড় শুরুর আগেই সাধারণ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, উপকূলবাসীকে সুরক্ষার জন্য ১ হাজার ৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, ১১৬টি মেডিকেল টিম কাজ করেছে।

প্রসঙ্গত, খুলনায় ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ২৮৩টি আশ্রয় কেন্দ্রের পাশাপাশি ৭৬৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে। দুর্যোগকালীন সময়ের জন্য শুকনা খাবার, সুপেয় পানি মজুদ রাখা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী উপকূলীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করতে কাজ করছেন।

ফেসবুকে লাইক দিন