পাকিস্তানের প্রতি সুর নরম মোদির, এখন আলোচনার বার্তা

ইমান২৪.কম: কড়া অবস্থান থেকে সরে এসে ইসলামাবাদকে ফের আলোচনার বার্তাই দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

অথচ গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সামরিক কনভয়ে জঙ্গি হামলার পর পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন, ‘আলোচনার পাট শেষ।’

কিন্তু বুধবার সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের সঙ্গে বৈঠকের পর সুর কিছুটা নরম করে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘সামগ্রিক আলোচনা যেখানে শুরু হতে পারে, ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে সে রকম পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।’

পুলওয়ামার হামলার পরে জইশ-ই-মহম্মদ নেতা মৌলানা মাসুদ আজহারকে জাতিসংঘের জঙ্গি তালিকায় আনার দাবি জানিয়েছিল ভারত। আর ঠিক সে সময়ই পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলেন যুবরাজ সালমন। তখন পাকিস্তান-সৌদি যৌথ ঘোষণাপত্রে জাতিসংঘের জঙ্গি তালিকা নিয়ে রাজনীতির অভিযোগ আনা হয়েছিল।

বুধবার সেই ঘোষণাপত্রের উল্টো পথে হেঁটেছেন সালমান। সৌদি-ভারত যৌথ বিবৃতিতে বলছে, ‘জঙ্গির পাশাপাশি জঙ্গি সংগঠনকেও জাতিসংঘের নিষিদ্ধ তালিকায় আনার বিষয়টিতে জোর দেওয়া হয়েছে বৈঠকে।’ এই বিবৃতিতে সীমান্তে সন্ত্রাস বন্ধ, জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির আর্থিক সাহায্য বন্ধ করা, সবই রয়েছে বিবৃতিতে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক গোপন সূত্রের বরাত দিয়ে ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকাটি বলছে, সৌদি যুবরাজের সঙ্গে বৈঠকের পরে এ কথা স্পষ্ট যে, পুলওয়ামা-পরবর্তী পরিস্থতি সামলাতে কূটনৈতিক পথেই হাঁটছে দিল্লি।

পাকিস্তানের প্রতি সুর নরম মোদির, এখন আলোচনার বার্তা

সৌদি আরব পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই সে দেশের নেতৃত্বকে পাশে রেখে বার্তা দেওয়া হয়েছে ইসলামাবাদকে। বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের মে থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে মোদি যে ব্যক্তিগত ভাবে উদ্যোগী হয়েছিলেন,তার প্রশংসা করেছেন সালমন।

যদিও এতদিন ধরে সাউথ ব্লকের অবস্থান ছিলো, ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে তৃতীয় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না । কিন্তু সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে পাকিস্তান প্রসঙ্গে সেই অবস্থান থেকে সরে এল নরেন্দ্র মোদির সরকার।

যদিও ওই বৈঠকে পুলওয়ামার হামলা এবং পাকিস্তানের মাটিতে জঙ্গিদের আবাস গড়ে ওঠা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য ও প্রমাণ তার সামনে হাজির করেছে দিল্লি।

সৌদি যুবরাজ বলেন, ‘আমাদের দু’দেশের একটি সাধারণ উদ্বেগ হল সন্ত্রাসবাদ এবং মৌলবাদ। ভারত এবং প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে আমরা সহযোগিতা করব, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদ থাকে। এ ব্যাপারে ভারতের ভূমিকাকে আমরা সমর্থন করি।’

তিনি জানান, সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো ধ্বংস করা এবং জঙ্গি সংগঠনগুলির অর্থের জোগান বন্ধ করতে দু’দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় হবে। খুব শীঘ্রই শুরু হবে যৌথ নৌ-মহড়াও।

পাকিস্তানের নাম না-করে মোদি বলেন, ‘যে সব দেশ সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করছে, তাদের উপরে চাপ তৈরি করা হবে। যুবশক্তি যাতে বন্দুক হাতে না-তোলে, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ভারত এবং সৌদি আরব সন্ত্রাসকে কোনও বিশেষ জাতি বা সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করার বিরোধী।

কূটনীতিকদের অভিমত, মোদি এই বিবৃতিতে পাকিস্তানকে পরোক্ষভাবে আলোচনার বার্তাই দিলেন।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আলোচনার মাধ্যমে ভারত-পাক সমস্যা মেটানোর কথা বলেছেন।

ভারত-পাকিস্তান: সামরিক শক্তিতে কোন দেশ এগিয়ে?

ভারত-পাকিস্তান: সামরিক শক্তিতে কোন দেশ এগিয়ে?

ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে নিষিদ্ধ জইশ-ই-মোহাম্মদ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আত্মঘাতী বোমা হামলায় দেশটির আধাসামরিক বাহিনীর ৪৯ জোয়ান নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে পাকিস্তান-ভারত উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ হামলার কঠিন জবাব দিতে দেশটির সেনাবাহিনীকে যে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার অনুমতি দিয়েছেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান যে কোনো হামলার জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

১৯৪৭ সাল থেকে দেশ ভাগের পর কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অনেকবার যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্যাটেজিক স্টাডিজের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী (আইআইএসএস) দেশ দুটির সামরিক অবস্থান জানা যায়।

>সেনাবাহিনীর বাজেট:

২০১৮ সালে ভারত ৫৮ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করে। যা দেশটির জিপিডির ২.১ শতাংশ। এর মধ্যে ১.৪ মিলিয়ন ডলার শুধু সক্রিয় সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ করা হয়।

গত বছর পাকিস্তান ১১ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করে যা জিপিডির ৩.৬ শতাংশ। এটি ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৮০০ সেনাবাহিনীর জন্য। এটি ২০১৮ সালে বিদেশি সামরিক সহায়তায় হিসেবে ১০০ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে।

>ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র:

ভারত ও পাকিস্তান দেশ দুটিই ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র ক্ষমতাসম্পন্ন। ভারতের ৯ ধরনের সচল ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে অগ্নি-৩ যার পরিসর ৩ হাজার কিলোমিটার থেকে ৫ হাজার কিলোমিটার (৩ হাজার ১০৬ মাইল)। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্র সিএসআইএসের তথ্য অনুযায়ী।

পাকিস্তানে ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম চালু রয়েছে। এর মধ্যে ভ্রাম্যমাণ ছোট ও মাঝারি পাল্লার আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে, যে গুলো ভারতের যে কোনো অংশে পৌঁছাতে পারে। সূত্র: সিএসআইএস। এছাড়া শাহিন-২ নামে পাকিস্তানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এর পরিসর ২ হাজার কিলোমিটার বা ১ হাজার ২৪২ মাইল।

পাকিস্তানের ১৪০-১৫০টি পরমাণুবাহী যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে। তুলনার দিক দিয়ে ভারতের ১৩০-১৪০টি রয়েছে। সূত্র: এসআইপিআরআই।

>সেনাবাহিনী:

ভারতের ১২ লাখ শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে। এদের সহযোগিতার জন্য রয়েছে ৩ হাজার ৫৬৫ যুদ্ধ ট্যাংক, ৩ হাজার ১০০ পদাতিক বাহিনীর যুদ্ধযান, ৩৩৬টি সাঁজোয়া যান ও ৯ হাজার ৭১৯টি আর্টিলারি।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রায় একই ধরনের যুদ্ধ সরঞ্জাম রয়েছে। ৫ লাখ ৬০ হাজার সেনাবাহিনীর জন্য ২ হাজার ৪৯৬টি ট্যাংক, ১ হাজার ৬০৫টি সাঁজোয়া যান, ৪ হাজার ৪৭২টি আর্টিলারি গান ও ৩৭৫টি স্ব-চালিত হ্যালোজার্স।

এ মাসের আইআইএসএসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের বিশাল এ সেনাবাহিনীর জন্য অপর্যাপ্ত সহযোগিতা, পরিচর্যা এবং গোলাবারুদ ছাড়াও খুচরা যন্ত্রাংশ ঘাটতি রয়েছে।

>বিমানবাহিনী:

ভারতের ১ লাখ ২৭ হাজার ২০০ কর্মী বাহিনীর জন্য ৮১৪টি যুদ্ধবিমান রয়েছে। ভারতীয় বিমান বাহিনী বেশ বড় হলেও তার যুদ্ধ জেট বিমান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার জন্য ৪২টি স্কোয়াড্রন জেট দরকার। প্রায় ৭৫০টি বিমান, চীন ও পাকিস্তান আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য। রাশিয়ার পুরাতন মিগ-২১ যুদ্ধবিমান রয়েছে যা প্রথম ১৯৬০ সালে ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো শীগ্রই অবসরের পথে রয়েছে। ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতের ২২টি স্কোয়াড্রন থাকতে পারে। দেশটির কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী।

পাকিস্তানের ৪২৫টি যুদ্ধবিমান রয়েছে। এর মধ্যে চীনের তৈরি এফ-৭পিজি এবং আমেরিকান এফ-১৬ ফ্যালকন যুদ্ধবিমান রয়েছে। পাকিস্তানের ৭টি বায়ুবাহী পূর্ব সতর্কতা নিয়ন্ত্রিত বিমান রয়েছে যা ভারতের চেয়ে তিনটি বেশি। আইআইএসএসের সূত্র অনুযায়ী। ভারতীয় সেনারা নতুন মারাত্মক স্নাইপার রাইফেল এলওসি পেয়েছে।

পাকিস্তানের আইএসআরের তথ্য অনুযায়ী দেশটির বিমান বাহিনীকে আধুনিকায়ন করে সাজানো হচ্ছে।

>নৌবাহিনী:

ভারতের নৌবাহিনীর একটি বিমান বহনকারী, ১৬টি সাবমেরিন, ১৪টি সাবমেরিন ধ্বংস করার ক্ষেপণাস্ত্র, ১৬টি উপকূলীয় যুদ্ধজাহাজ ও ৭৫টি যুদ্ধ ক্ষমতাসম্পন্ন বিমান। দেশটির নৌবাহিনীর সামুদ্রিক ও নৌবিমান কর্মীসহ ৬৭ হাজার ৭০০ কর্মী রয়েছে।

পাকিস্তানের উল্লেখযোগ্য সমুদ্রতল রয়েছে, দেশটির ৯ ফ্রিগেটস, ৮টি সাবমেরিন, ১৭টি সামুদ্রিক যুদ্ধজাহাজ এবং ৮টি যুদ্ধ ক্ষমতাসম্পন্ন বিমান রয়েছে।

আরও পড়ুন:  পাক-ভারত সীমান্তে গোলাগুলি : মর্টার শেল ও ভারী গোলাবর্ষণ

চুপ করে বসে থাকবো না, পাল্টা হামলা চালাব: ইমরান খান

হামলার জবাব দিতে কতটুকু প্রস্তুত ভারতের সেনাবাহিনী?

ভারত-পাকিস্তান সিমান্ত রণসাজে সজ্জিত, ৬০০ ট্যাংক পাঠালো পাকিস্তান

আবারও ব্যাপক সংঘর্ষ কাশ্মীরে, ভারতীয় বাহিনীর মেজর-সহ নিহত ৫

জাপানি নারীর ইসলাম গ্রহণের হৃদয়বিধারক ঘটনা ও পর্দার প্রতি সন্মান

ফেসবুকে লাইক দিন