পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম রাজনীতির উত্থান

ইমান২৪.কম: পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য অ্যাসেম্বলি নির্বাচনের আগে ‘মুসলিম ভোটারদের’ ইস্যুটি অনেক বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের (এআইটিসি) উপর এটা বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম ইস্যুটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এই মুহূর্তে ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি।

২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা ২৭ শতাংশের একটু বেশি। অর্থাৎ রাজ্যের প্রতি তিনজন ভোটাদের একজন হলো মুসলিম, যাদের অধিকাংশই সুন্নী। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা প্রথমে কংগ্রেসকে সমর্থন দিয়েছিল। এরপর সিপিআই-এমের নেতৃত্বাধীন বাম ফ্রন্ট এবং ২০১১ সাল থেকে তারা মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন দিচ্ছে। ২৯৪টি অ্যাসেম্বলি আসনের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই রয়েছে দক্ষিণ বাংলায়। ২০১১ ও ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে মুসলিমরা সেখানে ব্যাপকহারে তৃণমূলকে ভোট দিয়ে জিতিয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালে এসে এই তৃণমূলের ব্যাপারে এই সম্প্রদায়ের ধারণাটা বদলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। কলকাতার পূর্ব প্রান্ত ঘুরে অন্তত তেমনটাই মনে হয়েছে।

তোপসিয়া নিজেই একটা জগৎ। শুধু ইট সুড়কির তৈরি ভবনগুলোর বাতাসশূন্য ঘরগুলোতে প্রচুর শ্রমিক কাজ করছে, দেশের ও বিদেশের বাজারের জন্য চামড়ার পণ্য সেলাই করছে তারা। নোংরা আবর্জনার এই পরিবেশের মধ্যে দেখা যাবে শহরের অভিজাত পাড়া থেকে মার্সিডিজে করে মানুষ আসছে তোপসিয়ায়। এদের একজন পঞ্চাশোর্ধ সাইয়েদ জামিরুল হাসান। অল ইন্ডিয়া মসলিস-ই-ইত্তেহাদ-উল-মুসলিমিনের (আইমিম) আহ্বায়ক তিনি। ১৪টি কারখানা রয়েছে তার আর শীর্ষ চামড়াজাত পণ্য রফতানিকারকদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

হাসান একসময় নেহরু-গান্ধী পরিবারের বংশধর সঞ্জয় গান্ধীর জুনিয়র সহকারী ছিলেন। এখনো বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদদের সাথে যোগাযোগ রয়েছে তার। বাংলায় আইমিম দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। সংখ্যালঘুদের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল দলটির নেতৃত্বে আছেন হায়াদ্রাবাদ-ভিত্তিক লিঙ্কনের ব্যারিস্টার-রাজনীতিবিদ আসাদুদ্দিন ওয়াইসি। অবাঙ্গালি হাসান বলেন: “আমি জানি না আইমিম এই নির্বাচনে কোন প্রার্থী দেবে কি না, এটা ওয়াইসির সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে। কিন্তু যদি তারা দেয়, তাহলে সেটা তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। আর যদি তারা না দেয়, তাহলে সমস্যাটা হবে আইমিমের, কারণ দারুণ একটা গতি সৃষ্টি হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ আমাদের সমাবেশে যোগ দিচ্ছে”। এর আগে তিনি তৃণমূলের হয়ে কাজ করেছেন।

হাসান বলেন, আইমিম প্রচারণা চালাচ্ছে, তবে প্রকাশ্য সমাবেশের মাধ্যমে নয়, সোশাল মিডিয়া এবং মেসেজিং গ্রুপগুলোর মাধ্যমে, কারণ তারা দমন পীড়নের ভয় পাচ্ছে। “এমনকি আমাকে পর্যন্ত দুই সপ্তাহ আটকে রাখা হয়েছিল। বোঝা যাচ্ছে তৃণমূলের মধ্যে আইমিমকে নিয়ে গভীর ভয় তৈরি হয়েছে”। বিজেপি হিন্দু পুনর্জাগরণ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং তাদের উত্থানের পর ভারতে মুসলিম নেতৃত্বাধীন দলের প্রসার ঘটেছে। যদিও বেশির ভাগ দলই রাজ্য পর্যায়ের, তবে আইমিম জাতীয় পর্যায়ের দল। ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই সামনের সারিতে আছে আইমিম, বললেন কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল মতিন। বাংলা ও ভারতে মুসলিম রাজনীতির পরিক্রমা নিয়ে গবেষণা করেছেন মতিন।

তিনি বললেন, “আইমিমের মতো মুসলিম-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর উত্থান সর্বভারতীয় কোন ঘটনা নয়, বরং যে সব রাজ্যে উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনগোষ্ঠি এবং তাদের একটা রাজনৈতিক ইতিহাস আছে, সেখানে এই দলগুলোর উত্থান হচ্ছে (যদিও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো উত্তর প্রদেশ)। বাংলা আর আসামে এই ধরনের দলগুলো বাড়ছে”।

বড় বিতর্ক: মুসলিমদের কি তাদের নিজস্ব দল থাকা উচিত, কারণ এ ধরনের দল নিশ্চিতভাবে মধ্যমপন্থী-জাতীয়তাবাদী-সেক্যুলার দলগুলোর ভোট কমিয়ে দেবে এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপির বিজয়কে আরও নিশ্চিত করবে? না কি তাদের উচিত তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেসের মতো দলগুলোর দ্বিতীয় সহযোগী হিসেবে কাজ করা?

২০১৬ সালের আসাম নির্বাচনে ইঙ্গিত মিলেছে যে, মুসলিম ভোট মধ্যমপন্থী-জাতীয়তাবাদীদের হারানো এবং বিজেপির বিজয়ের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। আসামে বিজেপির বিজয়ের কারণে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যেখানে মূলত মুসলিমদের টার্গেট করা হয়েছে। সে কারণেই আসন্ন নির্বাচনে আসামের মুসলিম নেতৃত্বাধীন দল অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) ও কংগ্রেস একটা মহাগাটবন্ধন করার ব্যাপারে মোটামুটি ৯৫% রাজি হয়ে আছে বলে এআইইউডিএফের ভেতরের একটি সূত্র জানিয়েছে।

২০১৬ সালে এআইইউডিএফ আর কংগ্রেস আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল এবং পূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যটিতে বিজেপি ক্ষমতায় যায়, যেখানে ৩০ শতাংশের বেশি মুসলিম রয়েছে। আইমিম অনেক রাজ্যেই কংগ্রেসের অবস্থানের ক্ষতি করছে এবং রাহুল গান্ধীসহ কংগ্রেসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতারা প্রায় নিয়মিত আইমিমের সমালোচনা করেন এবং তাদেরকে বিজেপির দ্বিতীয় বা তৃতীয় দল হিসেবে বর্ণনা করেন। ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির কাছে উত্তর ও মধ্য বাংলায় ১১টি আসনের মধ্যে নয়টি হারিয়েছে, যেখানে আইমিম কোন ভূমিকায় ছিল না। ২০২১ সালে যদি আইমিম প্রার্থী দেয়, তাহলে তৃণমূলের দুর্দশা আরও বহু বেড়ে যাবে।

সম্ভবত এ কারণেই তৃণমূলের প্রধান মমতা ব্যানার্জি বলেছেন যে, মুসলিম ভোটারদের টানার জন্য আইমিম ‘বিজেপির কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে’। আইমিম অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মতিন বলেন, যুক্তিটা হলো নির্বাচনী রাজনীতিতে আইমিম বা মুসলিম দলগুলোর তৎপরতা কংগ্রেস বা তৃণমূলের মতো সেক্যুলার ফ্রন্টগুলোকে হারিয়ে দিচ্ছে এবং এটা একটা ‘বিচ্ছিন্নতার’ প্রক্রিয়া। মতিন বলেন, “এটা খুবই আপত্তিকর যে, আইমিম যখন কংগ্রেসের সাথে ছিল (২০০৪-২০০৯), তখন তাদের সেক্যুলার দল মনে করা হয়েছে, কিন্তু এখন তাদেরকে বিজেপির এজেন্ট বলা হচ্ছে। এই সংকীর্ণ বিচ্ছিন্নতাবাদ – সাম্প্রদায়িক সেক্যুলার বিভাজনের এই ধারণা তৈরি করেছে সরকারী মুসলিম আর রাজনৈতিক দলগুলো। এটা খুবই বিভ্রান্তিকর”।

তিনি মনে করেন, সামাজিক ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য মুসলিমদের এখন একটা দলের খুবই প্রয়োজন। তিনি বলেন, “সাম্প্রদায়িক-সেক্যুলার বয়ান প্রায়ই গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং শিক্ষা ও চাকরির মতো সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের বঞ্চিত করে। সে কারণে, মুসলিমরা যদি আলাদাভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চায়, তাহলে সেখানে মোটেও ভুলের কিছু নেই”। মতিন উল্লেখ করেন, “দিন শেষে আইমিম বা এআইইউডিএফের মতো মুসলিম দলগুলো আসলে নিজেদের সম্প্রদায় থেকে উঠে আসছে এবং সম্প্রদায়ের মধ্যেই কাজ করছে। তথাকথিত সেক্যুলার দলগুলোর সাথে যে সব মুসলিম নেতারা রয়েছে, তাদের চেয়ে মুসলিম দলগুলোর নেতারা বেশি সক্রিয় এবং তাদের সম্প্রদায়ের প্রতি অধিক দায়বদ্ধ”। তিনি এটা অস্বীকার করেন না যে, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান না হলে ‘চলমান মুসলিম রাজনৈতিক পুনর্জন্ম’ হয়তো সম্ভব হতো না। কিন্তু সব নেতিবাচকতার মধ্যেই কিছু ইতিবাচক দিক থাকে বলে যুক্তি দেন তিনি।

আইমিমের অবশ্য একটা অসুবিধা রয়েছে। এই দলটি মূলত হায়দ্রাবাদের (যেখানে এটা মূলত উর্দুভাষী বা মুসলিম সম্প্রদায়ের ব্যবহৃত হিন্দুস্তানী ভাষাভাষির দল)। কিন্তু পশ্চিম বঙ্গে ৯০ শতাংশ মুসলিমই কথা বলে বাংলায়। আর পশ্চিম বঙ্গের অবাঙালি মুসলিমদের সাথে বাঙালি মুসলিমদের ঐতিহ্যগতভাবে একটা সমস্যা চলে আসছে, কারণ অবাঙালি মুসলিমরা তাদের আর্থিক শক্তির কারণে বেশি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকেন, যেটা কলকাতাতেও দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের ইস্যু নিয়ে কাজ করেন তরুণ সাংবাদিক মোকতার হোসেন মন্ডল। তিনি বলেন, “মমতা ব্যানার্জি অনেক বছর ধরেই শুধু অবাঙালি মুসলিমদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন”।

আব্বাস সিদ্দিকির উত্থান: কিন্তু আইমিমের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে মমতা ব্যানার্জির সামনে। মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য অনেক বড় দুঃস্বপ্ন হলো দক্ষিণ বাংলার আলেম, ত্রিশোর্ধ আব্বাস সিদ্দিকি। সোশাল মিডিয়ায় সিদ্দিকির তৎপরতা যথেষ্ট জোরালো, এবং তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, ২০২১ সালের নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, দক্ষিণ বাংলায় একটি জনসভায় তিনি বলছেন, “৪৪টি আসনে আমরা প্রার্থী দেবো এবং অন্যদের সাথে সমন্বয় করবো”। আর জনসভার পর জনসভায় হাজার হাজার মুসলিম যুবকদের সামনে সিদ্দিকি মুসলিমদের সামাজিক ক্ষমতায়ন এবং দারিদ্রের সমস্যার কথা বলছেন, যে ইস্যুগুলো মূলধারার রাজনীতিবিদরা সাধারণত আলোচনায় আনেন না।

সিদ্দিকি তার বক্তৃতায় বলেন, “ও আমার আল্লাহ! আমি নবীর (নবী মোহাম্মদ) পরিবারের বংশধর এবং আমি আপনাদেরকে এই প্রশ্ন তোলার জন্য অনুরোধ করছি – ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যে সব পরিবার জীবিকা হারিয়েছে, তাদের কথা কে বলবে? রাজনীতিবিদরা জনসভা করার সময় করোনার কথা ভাবছেন না, কিন্তু লোকাল ট্রেনগুলো তারা বন্ধ করে দিয়েছেন, যেটা হকার, রিক্সা-চালক, ফেরিঅলাদের জীবিকা ধ্বংস করে দিয়েছে, যারা এই লোকাল ট্রেনের উপর ভিত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করে”। (প্রথম কিস্তি) লেখক: শুভজিৎ বাগচি, কলকাতা।
সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর

ফেসবুকে লাইক দিন