নৌকা বেয়ে শিশুরা আজও স্কুলে যায়… আর নয় বেশি দিন!

পিরোজপুরের নাজিরপুর গাওখালী বাজার এলাকার দেউলবাড়ী ডোবরা ইউনিয়নের মনোহরপুর, সাতিয়া, পদ্মডুবি ও পূর্ব মগরজোরের মানুষগুলো এখন তাকিয়ে আছে সরকারের একটি প্রকল্পের দিকে। প্রকল্পটির আওতায় এখানে চারটি সাইক্লোন সেন্টার করা হবে। এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে সাক্লোনসেন্টারগুলো নির্মাণের দরপত্র চাওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তবে সাইক্লোন সেন্টারের চেয়েও বড় প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন এইসব গ্রামবাসী তারা জেনেছেন, প্রকল্পের আওতায় কেবল যে সাইক্লোন সেন্টার হবে তা-ই নয়, এসব সেন্টারে পৌঁছানোর জন্য বিলের মধ্য দিয়ে গ্রামগুলোকে সংযুক্ত করতে নির্মাণ করা হবে সড়ক।

আর সেই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে খুশি এই অঞ্চলের স্কুল শিক্ষার্থীরা। কারণ তাদের স্কুলে যাওয়ার এখনো একটাই পথ নৌকা। ওরা জেনেছে তাদের স্কুলগুলোকেই পরিণত করা হবে সাইক্লোন সেন্টারে। আর সেই সেন্টারে যাওয়ার জন্য সড়ক হলে সেগুলো হবে তাদেরও স্কুলে যাওয়ার পথ।

সূত্র জানিয়েছে, এই অঞ্চলের চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এগুলোতে সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে সরকার।

যুগ যুগ ধরে এই গ্রামগুলো শিশু কিশোররা নৌকা চালিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা করে। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, এখনো জোয়ার ভাটায় নির্ধারিত হয় এসব স্কুলের সময়সুচি।

গত ১৮ জুলাই বুধবার ঢাকা এলজিইডি থেকে জরিপকারী একটি প্রতিনিধি দল দেউলবাড়ী ডোবরা ইউনিয়নের মনোহরপুর, সাতিয়া, পদ্মডুবি ও পূর্ব মগরজোর চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণের জন্য সয়েল টেস্ট ও জমি মাপঝোক করে ঢাকায় ফিরেছে। এই প্রতিনিধি দল আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের রিপোর্ট এলজিইডিতে জমা দেবে। এরপরই ভবনগুলো নির্মাণের জন্য দরপত্র আহবান করবে এলজিইডি।

এসর্ম্পকে ঢাকা এলজিইডি থেকে পরিদর্শনে যাওয়া সার্ভেয়ার মাহিম উদ্দিনের সঙ্গে সারাবাংলার কথা হলে তিনি এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আগামী ২০ দিনের মধ্যে তারা তাদের রিপোর্ট এলজিইডিতে জমা দেবেন।

সয়েল টেস্ট’র ফল সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে এই কর্মকর্তা জানান, মাটির কোনও সমস্য নেই। চার তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দোতালা ভবন নির্মাণ করা হবে।

পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলা থেকে উত্তর পূর্বকোণে এবং গাওখালী বাজার থেকে উত্তর দিকে ছয় কিলোমিটার দুরে মনোহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ স্কুলটিসহ এখানকার আরও তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চারপাশেই বিস্তীর্ণ অঞ্চল বছরের অধিকাংশ সময়েই পানির নিচে থাকে। এক কথায় বিলের মধ্যেই নির্মিত হয়েছে এ স্কুলগুলো।

স্থানীয়রা জানান, ছোট-ছোট নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুগের পর যুগ স্কুলে আসা-যাওয়া করে শিশুরা। তবে এই বাধা তাদের থামিয়ে রাখতে পারেনি। নাজিরপুরের এসব প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সরকারের উচ্চপদে চাকরি করেছেন এখন অনেকেই।

এমনই একজন মনোজ হালদার। বর্তমানে বরিশাল বিএম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষক। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, স্মৃতিগুলো আজও মনে পড়ে। আমরা অনেক কষ্ট করেই স্কুলে যেতাম। তবে কষ্টের দিকটি হচ্ছে আজও আমাদের শিশুদের নৌকা বেয়েই স্কুলে যেতে হচ্ছে। সাইক্লোন সেন্টার ও সড়ক নির্মাণের খবর শুনে এই শিক্ষক বলেন, সেটা যদি হয়, আমরা ভীষণ আনন্দিত হবো। দেশে অনেক অসাধ্য কাজ আজ সাধন করা হচ্ছে- এই বিলের মধ্য দিয়ে ছড় কিলোমিটার সড়ক নির্মাণও সম্ভব। আর তা করা হলে এই অঞ্চল থেকে আরও অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বেরিয়ে আসবে।

সমাজ সেবা অধিদফতরের উপ পরিচালক স্বপন কুমার হালদারও নৌকা বেয়ে স্কুলে যেতেন তার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার দিনগুলোতে। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা জীবনে নৌকা চালিয়ে স্কুলে গিয়েছি। কখনো নদী সাতরিয়েও স্কুলে গিয়েছি। আবার কখনো ভেলায় চড়েও স্কুলে গিয়েছি। আমি চাই আমাদের শিশুদের জন্য এই কষ্টের দিনগুলো না থাকুক।

শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেলো, ওদের কাছে স্কুলে যাওয়ার জন্য বর্ষা মওসুমটিই বেশি পছন্দের। এ সময় পানি বেশি থাকে। সহজেই নৌকা চালিয়ে তারা স্কুলে যেতে পারে। এরপর পানি যখন কমে আসে তখন জোয়ার ভাটায় তাদের স্কুলের সময় নির্ধারণ করতে হয়। কারণ ভাটা হলে আর নৌকা চলে না। আর শীত এলে বিল শুকিয়ে গেলে তাদের পুরো ছয় কিলোমিটার পথ হেঁটেই পারি দিতে হয়।

এসব নিয়ে মনোহরপুর প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক সমীরণ রায়ের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বছরের ১২ মাসই শিক্ষকসহ শিক্ষার্থীদের র্দুভোগ পোহাতে হয়। ছয় কিলোমিটার রাস্তা হলে এই র্দুভোগ আর থাকবে না।

সমীরণ রায় জানান, দুর্গম, প্রত্যন্ত গ্রাম বলে স্কুল গুলোতে শিক্ষক আসতে চান না। ফলে বছরের অধিকাংশ সময়ই শিক্ষক কম নিয়ে তাকে স্কুল চালাতে হয়। দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সরকারের রয়েছে, তবে এসব স্কুলে আজও বিদ্যুৎ পৌঁছে নি।

গত ১৮ জুলাই ঢাকা থেকে প্রতিনিধি দল সেখানেও গিয়েছিলো জানিয়ে এই শিক্ষক বলেন, এবার আশাকরি সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ হবে। তার পাশাপাশি সড়ক হলে স্কুল শিক্ষার্থীদের কষ্ট ঘুচবে।

এই স্কুলের সাবেক ম্যনেজিং কমিটির সভাপতি বাবুল আকন সারাবাংলাকে বলেন, জানপ্রতিনিধিরা আশ্বাস দিয়েছেন, স্কুলে যাতায়াতের জন্য সড়ক নির্মাণ করে দেয়াসহ ভবন নির্মাণ হচ্ছে। সবাই অপেক্ষায় রয়েছেন।

তিনি বলেন,মনোহরপুর থেকে পদ্মাডুবি পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার সড়ক নির্মান হলে শিক্ষার্থীদের আর ঝুঁকি থাকেনা।

তিনি বলেন, যে বয়সে কোমলমতি অবুঝ শিশুদের নিরাপদে বাবা-মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা, সে সব কোমলমতি অবুঝ শিশুরা, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজেরাই নৌকা চালিয়ে স্কুলে যাচ্ছে প্রতিদিন।

বিলে বিষাক্ত সাপ, আসা-যাওয়ার পথে ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রপাত এসবের আশঙ্কার পাশাপাশি জোয়ার ভাটার তীব্র স্রোত এসব ঝুঁকিই রয়েছে এই পথে।

তবে এসব কিছু উপেক্ষা করে জ্ঞানের আলো বাড়াতে প্রতিদিন সংগ্রাম করে নৌকা চালিয়ে স্কুলে যাচ্ছে কোমলমতি অবুঝ শিক্ষার্থীরা। সরকারের নতুন উদ্যোগ তাদের এ কষ্ট কমিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করেন স্থানীয়রা।

সাইক্লোন সেন্টার ও সড়ক নির্মাণ সর্ম্পকে পিরোজপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী প্রশান্ত কুমার রায় সারাবাংলাকে জানান, পিরোজপুর জেলায় মোট ৬০ টি সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ হবে। এর মধ্যে দেউলবাড়ী ডোবরা ইউনিয়নের মনোহরপুর, সাতিয়া, পদ্মডুবি ও পূর্ব মগরজোর চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও রয়েছে।

তবে ওই এলাকায় সড়ক বা বেরিবাঁধ নির্মাণ হচ্ছে কিনা, এমন কোন প্রল্পের উদ্যেগ নেয়া হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই, বলেন নির্বাহী প্রকৌশলী।
সূত্র : সারাবাংলা

ফেসবুকে লাইক দিন