নেচে-গেয়ে লাশ দাফনের পর সেই ‘ভণ্ডপীরের’ আরেক ভিডিও ভাইরাল

ইমান২৪.কম: ঢোল-টগর বাজিয়ে নেচে-গেয়ে অনুসারীদের নিয়ে এক কিশোরের লাশ দাফনের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার কথিত পীর শামীমের আরেকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, শামীম আয়েশি ভঙ্গিতে ফুলের মালা গলায় দিয়ে চেয়ারে বসে আছেন। চারদিক থেকে তাকে ঘিরে নারী-পুরুষরা নেচে-গেয়ে ‘হরে হরে, হরে হরে; হরে শামীম, হরে শামীম’ বলে চিৎকার করছেন।

শামীম একটি বড় গামলায় দুই পা দিয়ে রেখেছেন। আর ভক্তরা দুধ দিয়ে তার পা ধুয়ে দিচ্ছেন, কেউবা চুমু খাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার হামাগুড়ি দিয়ে পায়ে মাথা ঠুকে তাকে সিজদা করছেন। মোবাইল ফোনে ধারণকৃত দুই মিনিট এক সেকেন্ডের এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়ে আবারও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। বইছে সমালোচনার ঝড়। এতে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য, ইউপি চেয়ারম্যানসহ এলাকার সাধারণ মানুষ অবিলম্বে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধের পাশাপাশি ‘ভণ্ডপীর’ শামীমের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এর আগে ১৬ মে রাতে পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামের মহাসিন আলীর কিশোর ছেলে আঁখি (১৭) ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। মহাসিন আলী ওই গ্রামের ‘ভণ্ডপীর’ শামীমের অনুসারী হওয়ায় ছেলের মরদেহ তার হাতে তুলে দেন। ওই দিন রাতে শামীম তার অনুসারীদের নিয়ে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নেচে-গেয়ে আঁখির মরদেহ দাফন করেন। স্থানীয় মুসল্লিরা এর তীব্র বিরোধিতা করলেও শামীম ও তার অনুসারীরা কর্ণপাত না করেই তাদের রীতি মেনে মরদেহ দাফন করেন। নেচে-গেয়ে মরদেহ দাফনের ওই ভিডিও মোবাইলে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দিলে তা ভাইরাল হয়।

কে এই শামীম?: শামীমের পুরো নাম মো. শামীম রেজা। তার বাবা মৃত জেসের মাস্টার ছিলেন স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। তার বড় ভাই শান্টুও স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন।শামীম পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামের ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ১৯৮৪ সালে ফিলিপনগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বি কম পাস করে পরে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এম কম পাস করেন তিনি।

পড়ালেখা শেষ করে ঢাকার জিনজিরা এলাকায় একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন শামীম রেজা। পরে ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জের গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হন এবং খাদেম হিসেবে সেখানে বসবাস শুরু করেন। কথিত পীর গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হওয়ার পর থেকে শামীম পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও শামীমের সন্ধান লাভে ব্যর্থ হন। ২০০৭ সালে শামীম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু সে বিয়ে দুই-তিন মাসের বেশি টেকেনি। প্রায় বছর দুয়েক আগেই হঠাৎ করেই শামীম নিজ গ্রাম ইসলামপুর ফিরে আসেন এবং তার বাড়িতেই আস্তানা গড়ে তোলেন।

যে শামীম এক সময় জিন্সের প্যান্ট-গেঞ্জি পড়ে ঘুরে বেড়াতেন, এলাকায় ফিরে আসার পর দেখা যায় শামীমের মুখে লম্বা দাঁড়ি। গেরুয়া-পাঞ্জাবি পরা। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া প্রায় দুই বিঘা জায়গা নিয়ে শামীম বসবাস শুরু করেন। সেখানেই তার আস্তানা। শামীমের আস্তানায় দিনরাত সব সময় কমবেশি লোকজনকে আসা যাওয়া করতে দেখা যায়। ফকির-সাধু ভেবে এলাকাবাসী এতদিন তাকে গুরুত্ব দিতো না। কিন্তু দিন দিন শামীমের আস্তানায় তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষ, শিশু থেকে সব বয়সী মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকে। বছরে দু-একবার শামীমের আস্তানায় ওরশ বসে। তার শত শত ভক্ত-অনুসারীরা এখানে ভিড় জমান। নেচে-গেয়ে তারা শামীমের নাম যপ করতে থাকেন। এলাকাবাসী জানান, শামীমের ভক্ত-অনুসারীদের বেশিরভাগই অল্প বয়সী তরুণ-তরুণী। শামীম নিজে এবং তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন অনুসারী অশিক্ষিত এবং অল্প শিক্ষিত মানুষজনকে মগজ ধোলাই করে শিষ্যত্ব লাভে বাধ্য করেন।

ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী: নেচে-গেয়ে ঢোল-ডগর বাজিয়ে মরদেহ দাফন করা থেকে শুরু করে একের পর এক নানা কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে ইসলামপুর গ্রামের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-ফেসবুকে শামীমের একের পর নানা কর্মকাণ্ডের ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় এ নিয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। দৌলতপুর উপজেলা যুবলীগের ১ নম্বর যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ওয়াসিম কবিরাজ বলেন, ‘নেচে-গেয়ে ঢোল-ডগর বাজিয়ে লাশ দাফন করার পরের দিন আমরা স্থানীয় মসজিদের ইমামসহ এলাকাবাসী ইউএনও এবং ওসির কাছে গিয়েছিলাম। তারা আমাদের আইন হাতে তুলে না নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবিলা করার কথা জানিয়েছেন।’

ফিলিপনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ফজলুল হক কবিরাজ বলেন, ‘শামীম একজন ভণ্ড। ইসলামের নাম নিয়ে সে যেসব অপকর্ম করছে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’কথিত পীর শামীম প্রসঙ্গে কথা হয় কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আ ক ম সারোয়ার জাহান বাদশার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শামীম আর আমার ওয়ার্ড একই, ৬ নম্বর ওয়ার্ড। আমরা একই গ্রামের মানুষ। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় শামীম নিখোঁজ ছিল। ইসলামের নামে সে আস্তানা বানিয়ে যা করছে তা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।’

জানতে চাইলে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আক্তার বলেন, ‘শামীমের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড জানার পর আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সতর্ক করে দিয়েছি। এ ব্যাপারে কেউ তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে আমাদের পক্ষে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সুবিধা হবে।’

ফেসবুকে লাইক দিন