দেওবন্দে রাবেতায়ে মাদারিসিল আরাবিয়ার ত্রিবার্ষিক সম্মেলন সমাপ্ত : বিস্তারিত দেখুন

আজ সোমবার ১২’ মার্চ-২০১৮ ইংরেজি তারিখে বিশ্বখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে ত্রিবার্ষিক রাবেতায়ে মাদারিস প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেওবন্দের সিনিয়র উস্তাদ ও রাবেতায়ে মাদারিসের সেক্রেটারি মাওলানা শওকাত সাহেবের পরিচালনায় এবং দেওবন্দের মুহতামিম ও রাবেতায়ে মাদারিসিল আরাবিয়া এর সদর মুফতি আবুল কাসেম নোমানি সাহেবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছে এ প্রোগ্রাম। এতে হিন্দুস্থানের প্রায় ২৮ টি প্রদেশ থেকে ৩ হাজার মাদরাসার জিম্মাদারগণ অংশ নিয়েছেন। আজ সকাল ৮.১৫ মিনিটে পবিত্র কুরআনুল কারীম, তারানায়ে দারুল উলুম ও দেওবন্দের প্রিন্সিপাল মাও. আবুল কাসেম নোমানি সাহেবের উদ্ধোধনী বয়ানের মাধ্যমে শুরু হয়ে প্রথম অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটে দুপুর ১.০০ টায়। বিকালে খাওয়া-দাওয়ার বিরতি শেষে দ্বিতীয় ও শেষ অধিবেশন শুরু হয় বাদ মাগরিব।

অনুষ্ঠানের শুরুতে উদ্ধোধনী বক্তব্য দেন হযরত মুহতামিম সাহেব। উদ্ধোধনী বক্তব্যে হযরত মুহতামিম সাহেব বলেন, “ইসলাম শুরু হয়েছে পরামর্শের মাধ্যমে। যে কোনো কাজ পরামর্শ করে করলে তাতে বরকত লাভ হয়। সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পন্ন হয়। আজকের প্রোগ্রাম মূলত পরামর্শমূলক প্রোগ্রাম। হিন্দুস্থানের মাদরাসাসমূহ আজ দেশীয় অপচক্রান্তের কবলে পড়তে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় দীন, ইসলাম, মানুষের ইমান-আকিদা রক্ষা ও ধর্মীয় বিষয়াদীর হেফাজতের নিমিত্তে কিভাবে সামনের পদ্ধতি অবলম্বন করবো। সে বিষয়ে আজকের প্রোগ্রাম। তিনি আরো বলেন, দারুল উলুম দেওবন্দ মাদারে ইলমী বা সকল মাদরাসার জন্মদাতা। সে হিসেবে অন্যান্য মাদরাসার খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য আলাদা একটি জিম্মাদারীও রয়েছে। তাছাড়া রাবেতায়ে মাদারিসিল আরাবিয়া দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাও করা হয়েছে সে নিমিত্তেই। রাবেতা বা যোগাযোগ করার জন্য। মাদারে ইলমীর ডাকে আজকের আয়োজিত প্রোগ্রামে যারা অংশ নিয়েছেন। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।”

উক্ত প্রোগ্রামে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেওবন্দের সদরে মুদাররিস মুফতি মাঈদ আহমদ পালনপুরী, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি কারী উসমান সাহেব, আওলাদে রাসূল মাওলানা আরশাদ মাদানী, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ রাহমানী, সাবেক এমপি মুফতি মাহমুদ মাদানী, দেওবন্দের শায়খে ছানী মাওলানা কামারুদ্দীন, সিনিয়র উস্তাদে হাদীস মুফতি নেয়ামাতুল্লাহ আজমী, মাওলানা হাবিবুর রহমান আজমীসহ দেওবন্দের আসাতিযায়ে কেরাম। এছাড়া রাবেতায়ে মাদারিসিল আরাবিয়া দেওবন্দের প্রদেশভিত্তিক জিম্মাদারদের থেকে মাওলানা রমতুল্লাহ কাশ্মিরী, সদর, কাশ্মির, মাওলানা আশহাদ রশিদী, (পশ্চিম ইউপি, জোন-৩), মাওলানা শওকাত সাহেব, (পূর্ব ইউপি, জোন -১) হযরত মাওলানা নিজামুদ্দীন, (রোকন মহারাষ্ট্র), মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধূরী এমপি (সদর, বাঙ্গাল), মাওলানা বদরুদ্দিন আজমল এমপি, (সদর, আসাম) হযরত মাওলানা আশফাক সাহেব, (উত্তর ইউপি, জোন-২) আব্দুল কাইয়ুম সাহেব, (সদর, তেলেঙ্গানা) মাওলানা জহির আনওয়ার সাহেব কাশ্মিরী, (মুহতামিম, জামিয়া ইসলামিয়া বস্তি) মুফতি সাইদুর রহমান, (সদর, বোম্বাই), মাওলানা আব্দুশ শাকুর, (সদর, কেরেলা), মাওলানা মাহমুদ সাহেব, (রুকনে শুরা, দারুল উলুম রাজস্থান) মাওলানা যায়নুল আবেদীন, (সদর, কর্নাটক), আবুল কাসেম সাহেব, (সদর, বিহার) (৩০৩ জন জিম্মাদার) কারী আমীন সাহেব, (সদর, রাজিস্থান), মুফতি সিরাজ সাহেব, (সদর, মনিপুর), মাওলানা আশজাদ কাসেমী, (শায়খুল হাদিস, মুরাদাবাদ) সহ আরো অনেক দেশখ্যাত বিশ্ববরেণ্য উলামায়ে কেরাম উপস্থিত ছিলেন।

উপস্থিত উলামায়ে কেরামের মাঝে মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, মাদরাসার পড়াশুনা শুধু ছাত্রদের দ্বারাই সুন্দর করা সম্ভব নয়। বরং ছাত্রদের সাথে সাথে উস্তাদেরও সমান অংশগ্রহণ জরুরি। মাদরাসার উস্তাদগণ মোবাইল চালানোকে কঠোর হস্তে ছাত্রদেরকে দমন করে। কিন্তু নিজেরা দু’তিনটি ব্যবহার করে। এতে করে উস্তাদের এ প্রভাব ছাত্রদের উপর পড়ে। তাই না করা সত্ত্বেও লুকিয়ে লুকিয়ে তালাবারা মোবাইল ব্যবহার করে। তিনি আরো বলেন, আগে ছাত্ররা নিজেদের আগ্রহে মাদরাসায় ভর্তি হতো। কিন্তু বর্তমানে নিজেদের আগ্রহে নয়। বরং বাবা-মায়ের চাপে বা ভয়ে মাদরাসায় ভর্তি হয়। তাই ছাত্রদের যে শাওক ও যাওক মাদরাসার প্রতি ছিলো সময়ের পরিবরবত সেটা কমেছে বৈকি বাড়েনি। এ সময় তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।

মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ রাহমানী বলেন, দারুল উলুম দেওবন্দ শুধু ইলমী প্রতিষ্ঠান নয়। বরং দেশের সকল মাদরাসার সাথে সমান যোগাযোগ রেখে ইলমের শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিষ্ঠান।

মুফতি মাহমুদ মাদানী বলেন, একসময় মাদরাসা শিক্ষাকে সরকারীভাবে পরিচালনা করা হতো। বর্তমানে তা করা হয়না। মনমোহন সিং সরকার মাদরাসার শিক্ষাকে মুসলমান বাচ্চাদের জন্য বার্ধতামূলক করেছিলো। এবং এর পাঠ্যবিষয় কি হবে তাও নির্ধারণ করা হয়েছিলো। কোন ক্লাসের কোন কিতাব পড়ানো হবে তা যাচাই বাছাই করে নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে সে হিসেবেই চলছে ইলমে দীনের প্রতিষ্ঠান।

মাওলানা আরশাদ মাদানী বলেন, দারুল উলুম দেওবন্দ মাদারে ইলমী। মাদারে ইলমী হিসেবে সকল মাদরাসার খবর নেয়া জরুরি ছিলো। সে জরুরি বিষয় হিসেবেই আজকের প্রোগ্রাম।

আওলাদে রাসূল আল্লামা আরশাদ মাদানীর নামে প্রতিষ্ঠিত ইউটিউব চ্যানেল “MADANI TV” এর পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠান ভিডিও করা হয়। যা তাঁদের ইউটিউব চ্যানেলে পাওয়া যাবে বলে সংবাদ মাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন চ্যানেলটির পরিচালক।

সকাল ১১ টার দিকে মজলিস পরিচালক মাওলানা শওকাত আলী কাসেমী বস্তাভী রাবেতার সামনের তিন বৎসরের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। নিম্মে কয়েকটি তুলে ধরা হলো। পূর্বঘোষণা : রাবেতায়ে মাদারিস প্রোগ্রাম থেকে দেশের ভিতরে যারা মাদরাসার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে তাদের ব্যাপারে সকলকে সজাগ দৃষ্টি রাখার জন্য আহবার করা হচ্ছে। এবং পাশাপাশি সকল মাদরাসার নিয়মতান্ত্রিকতার প্রতি পরিপূর্ণ লক্ষ রাখার প্রতি আদেশ জারী করা হচ্ছে।

এলান : মোট ১০ টি।
১. মাদরাসার কানুন মজবুত করতে হবে।
২. মাদরাসার জায়গার কাগজ সমূহ ছহীহ রাখতে হবে।
৩. মাদরাসার সকল রেকর্ডকে সম্পূর্ণ ছহীহ রাখা।
৪. নেযাম চমৎকার ও আকর্ষণীয় করা।
৫. মাদরাসাকে হুকুমত থেকে দূরে রাখা।
৬. কোনো অপরিচিত ব্যক্তির থেকে দূরে থাকা। যদি অপরিচিত কেউ মাদরাসার মাথে সম্পৃক্ত থাকতে চায় তাহলে তাহকিক করা।
৭. মোয়ামেলা ও লেনদেন এর ব্যাপারে কোনো গাফলতি বা কমতি না করা।
৮. মাদরাসার সকল বিষয়ে শরীয়তের দিকে খেয়াল রাখা, কোনো সমস্যা হলে শরিয়তের দিকে রুজু করা। এ ব্যাপারে সকলকে বিশেষকরে সতর্ক করা হচ্ছে।
৯. মাদারেসের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করতে চায় তাদের প্রতি সদয় নজর রাখা।
১০. মাদারেসের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা মূলত অপশক্তির অংশ হিসেবে করা হয়। সুতরাং এ বিষয়ে অত্যান্ত সতর্কতার সাথে পথঅবলম্বন করা। আজকের সমাবেশ থেকে উপরোক্ত বিষয সমূহ নির্ধারণ করা হলো।

বেলা ১১ টায় ঘোষণা পাঠের পরে প্রদেশের জিম্মাদারগণ বক্তব্য দেন। এ সময় মহারাষ্ট্র সদরে রাবেতায়ে মাদারিস মুফতি ইসমাঈল সাহেব বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতে মাদারেসে দীনিয়ার ব্যাপারে আপনারা জানেন। দেশের ক্ষমতা পরিবর্তনের এ যুগে মাদরাসার সাথে সম্পৃতাকে মূর্খতার সাথে জড়ানো হয়। যা নিতান্তই দুঃখজনক। সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদেরকে আরো সতর্ক থাকতে হবে। দীনের সাথে সাথে জাগতিক বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা থাকতে হবে।

আরো বক্তব্য দিয়েছেন, ১. মাওলানা রমতুল্লাহ কাশ্মিরী, সদর, কাশ্মির ২. জনাব মাওলানা আশহাদ রশিদী, পশ্চিম ইউপি, জোন-৩ ৩. জনাব মাওলানা শওকাত সাহেব, পশ্চিম ইউপি, জোন -১ ৪. হযরত নিজামুদ্দীন, রোকন, মহারাষ্ট্র ৫. মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধূরী এমপি, সদর, বাঙ্গাল ৬. মাওলানা বদরুদ্দিন আজমল এমপি, সদর, আসাম ৭. জনাব হযরত আশফাক সাহেব, পূর্ব ইউপি, জোন-২ ৮. আব্দুল কাইয়ুম সাহেব, তেলেঙ্গানা ৯. জহির আনওয়ার সাহেব কাশ্মিরী, মুহতামিম, জামিয়া ইসলামিয়া বস্তি ১০. মুফতি সাইদুর রহমান, বোম্বাই আব্দুশ শাকুর, কেরেলা ১১. মাওলানা মাহমুদ সাহেব, রুকনে শুরা, দারুল উলুম রাজস্থান ১২. মাওলানা যায়নুল আবেদীন, সদর, কর্নাটক ১৩. আবুল কাসেম সাহেব, সদর, বিহার (৩০৩ জন জিম্মাদার) ১৪. কারী আমীন সাহেব,সদর, রাজিস্থান ১৫. মুফতি সিরাজ সাহেব, সদর, মনিপুর আশজাদ কাসেমী, শায়খুল হাদিস, মুরাদাবাদ। এছাড়া আরো অনেকেই বক্তব্য দিয়েছেন।

দেওবন্দ থেকে : মোস্তফা ওয়াদুদ

ফেসবুকে লাইক দিন