দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে আর বই বিলাবেন না সেই ‘সাদা মনের মানুষ’

ইমান২৪.কম: রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘুরে ঘুরে যে মানুষটি বই বিলিয়ে ফিরতেন দুয়ারে দুয়ারে কাল সকালে আর তাঁর পদচিহ্ন পড়বে না রাস্তায়। সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন ‘সাদা মনের মানুষ’ নামে পরিচিত বই পাগল পলান সরকার। আজ শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে নিজ বাস ভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ ছিলেন তিনি।

মাইলের পর মাইল হেঁটে দূর দূরান্তের গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কড়া নেড়ে বই দিতেন তিনি এবং তা আবার সপ্তাহখানেক বাদে ফেরত নিয়ে আসতেন। এভাবে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রামে হাজারো মানুষকে তিনি বইয়ের আলোয় আলোকিত করেছেন। ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমে পলান সরকারের এই বই দেয়া এবং নেয়ার মাধ্যমে সবার মাঝে বই পড়ার আগ্রহ গড়ে তোলার কথা দেশবাসীর নজরে আসে।

১৯২১ সালে নাটোর জেলার বাগাতি পাড়া গ্রামে পলান সরকারের জন্ম। মাত্র পাঁচ মাস বয়সে বাবা হায়াত উল্লাহ সরকারের মৃত্যুতে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর অর্থনৈতিক সংকটে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় তাঁর। এরপর তাঁর নানা ময়েন উদ্দিন সরকার মা মইফুন নেসাসহ পলান সরকারকে রাজশাহীর বাঘার থানার বাউসা গ্রামে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন।

সেখানে তিনি একটি স্কুলে ভর্তি হন যেখানে ষষ্ঠ শ্রেণির পর লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না। বাবা-মা নাম রেখেছিলেন হারেজ উদ্দিন সরকার। তবে জন্মের পর থেকেই মা ‘পলান’ নামে ডাকতেন। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে পলান সরকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন। কিন্তু বই পড়ার অভ্যাস থেকে যায় আজীবন।

যুবক বয়সে যাত্রাদলে স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ করতেন পলান সরকার। মাঝে মাঝে প্রম্পটের কাজ করতেন মঞ্চের পেছনে। আর এই কাজটিই তাঁর বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখে।

১৯৯০ সাল থেকে বাউসা হারুন অর রসিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিবছর যারা মেধাতালিকায় প্রথম দশটি স্থান অর্জন করত তাদের বই উপহার দিতেন পলান সরকার। এরপর অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও তাঁর কাছে বইয়ের আবদার করলে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি তাদেরও বই দিবেন তবে তা ফেরত দিতে হবে। এরপর গ্রামের মানুষও তাঁর কাছে বই চাইতে শুরু করে। এভাবেই শুরু হয় বই পড়া আন্দোলনের ভিত।

সাদাসিধা এই মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে বাউসা হারুন অর রসিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৬৫ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় ৫২ শতাংশ জমি দান করার পর প্রচারবিমুখ পলান সরকার স্থানীয়দের অনুরোধেই চেয়ারম্যান পদে আসীন হন। বাউসা বাজারে তাঁর একটি চালকলও রয়েছে।

১৯৯২ সালে ডায়াবেটিকসে আক্রান্ত হওয়ায় পলান সরকারকে হাঁটার অভ্যাস করতে হয়। তখন তিনি স্কুলকেন্দ্রিক বই বিতরণের প্রথা ভেঙে বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছে দেয়া এবং ফেরত নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে অন্যান্য জিনিসের পাশাপাশি তিনি বইও উপহার দেন।

এছাড়া যারা তাঁর চালকলে দেনা পরিশোধ করে তাদেরও তিনি বই উপহার দেন। তাঁর কর্মকাণ্ড সমাজে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এলাকার চায়ের দোকানী পর্যন্ত হয়ে ওঠে বই পাগল, প্রতি বিকালে তার দোকানে বসে বই পড়ার আসর। ২০০৯ সালে রাজশাহী জেলা পরিষদ তাঁর বাড়ির আঙিনায় একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে।

প্রথমে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার খুব অল্প সংখ্যক মানুষই পলান সরকারের এই অসামান্য শিক্ষা আন্দোলনের গল্প জানতেন। ২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিটিভি-তে ‘ইত্যাদি’ নামক জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে তাঁকে আলোকিত মানুষ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এরপর দেশের সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে চিনতে পারেন।

পলান সরকার ২০১১ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক লাভ করেন। ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে সারা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার দৈনিকে তাঁর ওপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাঁর জীবনের ছায়া অবলম্বনে বিটিভির জন্য গোলাম সারোয়ার দোদুল নির্মাণ করেন ঈদের নাটক ‘অবদান’। বিনা মূল্যে বই বিতরণ করে সকলের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টির করার জন্য ইউনিলিভার বাংলাদেশ পলান সরকারকে ‘সাদা মনের মানুষ’ খেতাবে ভূষিত করে।

আরও পড়ুন:  জামাত-ই-ইসলামিকে নিষিদ্ধ করল ভারত সরকার

সৌদি ভার্সিটিগুলোতে কওমি সনদ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন ধর্মপ্রতিমন্ত্রী

পাকিস্তানকে অকুণ্ঠভাবে সমর্থন দেয়ার ঘোষনা দিল তুরস্ক

বাবা-মাকে নিয়ে থাকলে বাসা ভাড়া কম ৫০০, যা বললো আলোচিত বাড়ির মালিক

শত্রুদের প্রতি সদয় হওয়া, ভালো ব্যবহার করা আল্লাহর রাসূলের নির্দেশ: পাক সেনা কর্মকর্তা

ফেসবুকে লাইক দিন