জীবন বাজি রেখে মসজিদে হামলাকারীর অস্ত্র কেড়ে নিয়ে মুসল্লিদের বাঁচায় এই যুবক

ইমান২৪.কম: নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টার্চে আল নূর মসজিদে বন্দুকধারীকে ঠেকানো না গেলেও লিনউড মসজিদে খ্রিস্টান বন্দুকধারীর গুলিবর্ষণের সময় যখন মুসল্লিরা লুটিয়ে পড়ছিল তখন অসীম সাহসের পরিচয় দিয়ে তিন ব্যক্তি হামলাকারীকে ঠেকাতে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লিনউড মসজিদে বন্দুকধারীর অস্ত্র কেড়ে নিতে সক্ষম হন এক যুবক। ফলে সেখানে হতাহত কম হয়।

হামলায় বেঁচে যাওয়া দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় এসব তথ্য জানিয়েছে নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড অনলাইন। লিনউড মসজিদে বন্দুকধারীর অস্ত্র কেড়ে নেওয়া যুবককে ‘হিরো’ বলেছে সংবাদমাধ্যমটি।

হামলার সময় লিনউড মসজিদে ছিলেন সৈয়দ মাজহারউদ্দিন। তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন ঘটনা। বেঁচে যাওয়া মাজহারউদ্দিন ঘটনার বর্ণনায় বলেন, তার বন্ধু কীভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বন্দুকধারীকে নিবৃত্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

মাজহারউদ্দিন এভাবেই বলছিলেন, “চারপাশে মানুষ ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। আমি গুলি থেকে নিজেকে আড়াল করতে চেষ্টা করলাম। আমি যখন আড়াল নিই তখন বন্দুকধারী লোকটি প্রধান প্রবেশদ্বারের দরজা দিয়ে ভেতরে আসে। মসজিদে তখন ৬০-৭০ জন লোক ছিল। মসজিদের মূল দরজার পাশে বৃদ্ধ লোকেরা বসে প্রার্থনা করছিলেন। বন্দুকধারী তাদের ওপর গুলি শুরু করে।’

মাজহারউদ্দীন আরও বলেন, “বন্দুকধারী এলোপাতাড়ি গুলি চালাচ্ছিল। এ সময় মসজিদ থেকে একজন লোক বন্দুকধারীকে মোকাবেলা করার চেষ্টা করে। সে ছিল তরুণ। সে মসজিদটির দেখাশোনা করত। সে একটি সুযোগ দেখেছিল এবং বন্দুকধারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিছু সময় ধস্তাধস্তির পর সে অস্ত্রটি কেড়ে নেয়।’’

ওই যুবককে নায়ক আখ্যায়িত করে মাজহারউদ্দীন বলেন, “যুবকটি বন্দুক কেড়ে নিলেও ওই শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তে ঠিকমতো ট্রিগার খুঁজে পায়নি। এর মাঝে বন্দুকধারী সরে পড়তে থাকলে যুবকটি তার পিছু দৌড়ে যায়। কিন্তু লোকটি একটি গাড়িতে উঠে পালিয়ে যায়, যেটিতে তার সঙ্গীরা অপেক্ষা করছিল।’’

এদিকে ডিনস এভিয়ায় আল নূর মসজিদে বন্দুক হামলার ঘটনায় একজন বেঁচে থাকা ব্যক্তি ক্রাইস্টচার্চ হাসপাতালের বাইরে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড পত্রিকায় আল নূর মসজিদের ভয়াবহ দৃশ্যের বর্ণনা করেন খালেদ আল-নোবানি নামের ওই ব্যক্তি। আল-নোবানি ও আরেকজন যুবক চেষ্টা করেছিলেন বন্দুকধারীর কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার।

তিনি বলেন, আল নূর মসজিদের ভেতরে সন্ত্রাসী লোকটি যুবক, বৃদ্ধ, নারী সবাইকে গুলি করছিল। ‘আমি একটি দরজা দিয়ে চলে যাই, গেটটি ভেঙে বাচ্চাদের প্রথমে নিতে শুরু করি। আমার বন্ধুরা সাহায্য করে।’

তিনি বলেন, ‘একজন লোক লাফ দিয়ে বন্দুকধারীর অস্ত্রটি ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু বন্দুকধারী তার দিকে সরাসরি গুলি করল।’ আল নোবানি আরও জানান, তিনিও ওই লোককে অনুসরণ করে বন্দুক কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বুঝতে পারেন যে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করতে পারবেন না।

হামলাটিকে ‘বর্ণবাদী ও ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করে টুইট বার্তায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেন, ‘দেশের পক্ষে আমি মুসলিম-বিশ্ব ও নিউজিল্যান্ডের জনগণের প্রতি শোক জানাই, যারা কিনা অত্যন্ত নিন্দনীয় এ কাণ্ডের শিকার হয়েছেন। (এটি) মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা বর্ণবাদ ও ইসলাম-বিদ্বেষেরই সর্বশেষ নজির।’

তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান আরও বলেন, ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুতা অলসভাবে দেখছে বিশ্ব। এই মুসলিমদের যে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করা হত, ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সীমান্ত ছাড়িয়ে তা গণহত্যায় রূপ নিয়েছে। যদি এখনই এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া না হয় তাহলে আমাদের আরেকটি বিপর্যয়ের খবর শুনতে হবে।

মালয়েশিয়ার ক্ষমতাসীন জোটের অন্যতম নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এমন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ‘এমন হামলা বিশ্বশান্তি ও মানবতার ওপর এক কালো ছায়া।’

পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এই হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ‘সন্ত্রাসবাদ কখনো ধর্ম হতে পারে না।’

এ নিয়ে টুইটারে একটি বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। শুক্রবার (১৫ মার্চ) জুমার নামাজের পর ঘটনাটি ঘটলেও প্রায় ১১ ঘণ্টা পর টুইট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁসহ অনেক বিশ্বনেতার টুইটে ‘উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের’ কথা বলা হলেও ট্রাম্পের টুইটে এ ধরনের শব্দ পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ‘মসজিদে ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের পর নিউজিল্যান্ডের জনগণের প্রতি আমার উষ্ণ সমবেদনা এবং শুভকামনা। ৪৯ জন নিরীহ মানুষ এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন (ঘটনায়) মারা গেলেন, আরও অনেকে গুরুতর আহত হলেন। নিউজিল্যান্ডের পাশে থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার সাধ্যের মধ্যে সম্ভব করবে। স্রষ্টা সবার সহায় হোন।’

প্রসঙ্গত, জুমার নামাজের পর মসজিদ দু’টিতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে চালানো ভয়াবহ এই হামলায় তিন বাংলাদেশিসহ অন্তত ৪৯ জন শহীদ হয়েছেন। এছাড়া আরও ৪৮ জন আহত হয়েছেন। গণহত্যা চালানোর আগে অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত এক শ্বেতাঙ্গ হামলাকারী অনলাইনে একটি পোস্ট করে জানায়, সে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদে বিশ্বাসী। দখলদারদের (অভিবাসী) ওপর প্রতিশোধ নিতেই সে এই হামলা করেছে।

আরও পড়ুন: নিউজিল্যান্ডে মসজিদে ভয়াবহ হামলার পর এবার সবচেয়ে বড় রেলস্টেশনে বোমা

নিউজিল্যান্ডের মসজিদে ভয়াবহ হামলাকারী খ্রিস্টান জঙ্গির পরিচয় প্রকাশ

নিউজিল্যান্ডে মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা ইসলামবিদ্বেষের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত: এরদোগান

রাশিয়ায় শিশুর দেহে প্রতি শুক্রবার ভেসে ওঠে কোরআন-হাদিসের বানী! (ভিডিওসহ)

মসজিদে ময়লা জুতা পায়ে ঢুকে কলিজায় আঘাত করেছ, প্রতিশোধ আমরা নেবই: এরদোগান

ফেসবুকে লাইক দিন