জাঁকজমক ভাবে ঐতিহাসিক ইস্তাম্বুল বিজয়ের ৫৬৮তম বার্ষিকী উদযাপন করলো তুরস্ক

ইমান২৪.কম: জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে ঐতিহাসিক ইস্তাম্বুল বিজয়ের ৫৬৮তম বার্ষিকী উদযাপন করলো তুরস্ক। পৃথিবীর ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া এই বিজয় উদযাপন করণার্থে দেশটির সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় যোগাযোগ অধিদপ্তর বিভাগ ইস্তাম্বুল মহানগরীতে একটি ভিজ্যুয়াল ফেস্টের আয়োজন করে।

আয়াসোফিয়া জামে মসজিদে পবিত্র কুরআনের ৪৮তম সুরা, সুরাতুল ফাতহ তিলাওয়াতের মধ্যদিয়ে শুরু হয় সেই ভিজ্যুয়াল ফেস্ট।

ফেস্টে লোকজন প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক গালাটা টাওয়ার ও আয়াসোফিয়ায় তাৎপর্যপূর্ণ ভার্চুয়াল স্কাই ম্যাপিং শো এর সাক্ষী হয়।

স্কাই ম্যাপিং শোতে প্রথমেই আয়াসোফিয়া জামে মসজিদের আকাশে পবিত্র কুরআনের إنا فتحنا لك فتحا مبينا এই আয়াতটি অর্থাৎ যে আয়াতের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক তার প্রিয় রাসূলকে বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছিলেন তা প্রদর্শিত হয় এবং তুর্কী ভাষায় তার অর্থও তুলে ধরা হয়।

পরবর্তীতে স্কাই ম্যাপিংয়ে একটি তেজস্বী ঘোড়ার পিঠে চড়ে থাকা ২১ বছরের দুঃসাহসী মুসলিম সেনাপতি ও শাসক ফাতিহ সুলতান মুহাম্মাদ খান বা সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহের অবয়ব তুলে ধরা হয়।

যেখানে দেখা যায় অজেয় কনস্টান্টিনোপলের দম্ভ চূর্ণ করা সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহের তেজস্বী ঘোড়াটি বিজয়ী হয়েও থেমে থাকতে চাইছে না বরং হ্রেষা ধ্বনিতে সামনের দুই পা তুলে আরো বিজয় অর্জনের জন্য এগিয়ে যেতে ব্যাকুল হয়ে আছে।

এর আগে তুর্কী যোগাযোগ অধিদপ্তরের পরিচালক ফখরুদ্দীন আলতুন তার এক টুইট বার্তায় ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ইস্তাম্বুল তার বিশেষ ছুটির দিনটি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করতে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, ১৪৫৩ সালের ৬ এপ্রিল থেকে ২৯ মে পর্যন্ত তৎকালীন আধুনিক রোম বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দুর্জেয় নগরী কনস্টান্টিনোপল উসমানী খলিফা সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ কর্তৃক অবরোধের শিকার হয়।

মূলত রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীসহ সকল মুসলিমের জন্য ভবিষ্যত বাণীতে কনস্টান্টিনোপল বা কুস্তুনতুনিয়া বিজয়ের সুসংবাদ, বিজয়ে নেতৃত্বদানকারী সেনাপতি ও তার দলের সৌভাগ্য বা উত্তমতার কথা বলার পর থেকেই যুগে যুগে মুসলিমরা অবরোধের মাধ্যমে তা বিজয়ের চেষ্টা চালিয়ে আসছিলো, যাতে তারাই ভবিষ্যত বাণীর সেই উত্তম কিংবা সৌভাগ্যবান নেতা বা তার দলের সদস্য হতে পারেন।

কিন্তু কনস্টান্টিনোপল জয় করা ছিলো একপ্রকার দুঃসাধ্য। এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই তা ছিলো বাইজেন্টাইন কিংবা আধুনিক রোম সাম্রাজ্যের একমাত্র অজেয় নগরী।

শহরটির ভৌগোলিক অবস্থান ত্রিভুজাকৃতির। তার উত্তরে রয়েছে গোল্ডেন হর্ন, পূর্বে বসফরাস প্রণালী ও দক্ষিণে মার্মার সাগর। এছাড়াও তিনদিক থেকে জলাবদ্ধ থাকায় শহরটি প্রাকৃতিকভাবেই ছিল সুরক্ষিত।

এটি কেবল যে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত ছিল তা নয়, তার চারদিকে ছিল ৪০ ফুট উঁচু ও ৬০ ফুট পুরুত্বের এক দুর্ভেদ্য ও অপ্রতিরোধ্য দেয়াল। দেয়ালে ৫০ মিটার অন্তর অন্তর একটি করে ওয়াচ টাওয়ার ছিল, যেখানে থেকে সহজেই শত্রু সেনাদের উপর গোলাবর্ষণ করা যেত এবং গরম পানি কিংবা তেল ঢেলে দেওয়া হতো।

কন্সটান্টিনোপল রক্ষায় গ্রিক ফায়ার নামে একটি অস্ত্রও বিশেষ ভূমিকা রাখত। এ অস্ত্র এতটাই ভয়ংকর ছিল যে এর আগুন পানি দিয়ে নেভানোও ছিল প্রায় অসম্ভব।

তাছাড়া যেকোনো ধরনের নৌ-আক্রমণ ঠেকানোর জন্য বসফরাস থেকে গোল্ডেন হর্নের জলপথে ছিল এক বিশালাকার শিকল বা চেইন। ফলে কোনো জাহাজ গোল্ডেন হর্ন অতিক্রম করতে চাইলেই চেইন টেনে সহজেই জাহাজের তলা ফাটিয়ে দেওয়া হতো। এতে করে শহরের পেছন দিক দিয়ে আক্রমণ করা ছিল একেবারেই অসম্ভব।

তরুণ সুলতান ফাতিহ অজেয় কনস্টান্টিনোপলের দম্ভ চূর্ণ করতে নিয়েছিলেন এক অভূতপূর্ব সমর কৌশল।

স্থলপথে প্রাচীর গুড়িয়ে দিতে হাঙ্গেরিয় ইঞ্জিনিয়ার আর্বানের সকল চাহিদা পূর্ণ করে তিনি বানিয়েছিলেন তৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ বিশালাকৃতির ব্যাসিলিকা কামান।

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রধান বাণিজ্যপথ বসফরাস প্রণালি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সুলতান বায়েজিদ কর্তৃক এশিয়া অংশে নির্মিত দুর্গের বিপরীতে ইউরোপ অংশে অবিশ্বাস্য কম সময়ে করেছিলেন আরেকটি দূর্গের নির্মাণ।

বাকি থাকলো শুধু গোল্ডেন হর্নের বিশালাকৃতির শিকলের ফাঁদ ও পোপের পাঠানো ভেনিসীয় নৌবহরের মোকাবিলা। ভেনিসীয় নৌ-বাহিনীর মোকাবিলা করে উত্তর দিক দিয়ে কনস্টান্টিনোপল প্রবেশ করতে হলে মুসলিম নৌবাহিনীকে পেরুতে হতো গোল্ডের হর্নের পানির নিচে ঝুলিয়ে লুকিয়ে রাখা শিকলের বাধা।

সৌভাগ্যবান বাহিনী নিয়ে উত্তম বিজয় অর্জন করতে যাওয়া সৌভাগ্যবান নেতা সুলতান ফাতিহ তখন এমন উত্তম পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন যাকে এখনো পৃথিবীর সেরা সমর কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শিকল বাধা পেরুতে আগের তুলনায় ছোট যুদ্ধ জাহাজ তৈরি করে সেনাদের অবর্ণনীয় ত্যাগের বিনিময়ে সুলতান ফাতিহ রাতের আধাঁরেই পাহাড়ের উপর দিয়ে গোল্ডেন হর্নের বাধা ডিঙাতে সক্ষম হোন।

সকালে পোপের নৌবাহিনী যখন পেরুনো সুলতানের নৌবাহিনীকে দেখে, তখন তারা দৈত্য দেখার ন্যায় হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে এবং আতঙ্কে জোরে জোরে চিৎকার করতে থাকে।

অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, অকল্পনীয় কৌশল ও আল্লাহর অশেষ রহমতে ১৪৫৩ সালের ২৯ মে শেষমেশ কনস্টান্টিনোপল বিজয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন সুলতান মুহাম্মাদ ।

রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মুসলিমদের কনস্টান্টিনোপল বা কুস্তুনতুনিয়া বিজয়ের ভবিষ্যতবাণী সুলতান মুহাম্মাদের নেতৃত্বে হওয়ায় তাকে ফাতিহ উপাধি দেওয়া হয়।

একারণেই তুর্কীরা তাকে ফাতিহ সুলতান মেহমেত হান এবং অন্যন্যরা সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ নামে স্মরণ করে থাকে।

তাছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যতবাণীর কুস্তুনতুনিয়া বিজয় এখন ইস্তাম্বুল বিজয় নামে লোকমুখে অধিক প্রচলিত।

ফেসবুকে লাইক দিন