কী আছে আসামের মুসলমানদের ভাগ্যে?

ইমান২৪.কম: বছর পঁচিশের তরতাজা যুবক হোসাইন আহমদ মাদানি। সময় এখন সুদূরের স্বপ্ন দেখা, কিন্তু এর বদলে হতাশা তাকে পিষে মারছে। উজ্জ্বল চোখে ভবিষ্যতের দিকে না তাকিয়ে খোলা দৃষ্টিতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের শঙ্কাটি অনুভব করার চেষ্টা করছেন। তার এই দুরবস্থায় পড়ার একমাত্র কারণ নাগরিকত্বের খাড়া। তীব্র খাড়াটি বেশ ভালো মতোই ঝুলছে তার মতো আরো অনেকের মাথার ওপর। গত ৩১ ডিসেম্বর আর ১ জানুয়ারির মধ্যবর্তী সময়ে প্রায় দুই কোটি মানুষ এখন নো-ম্যান্স ল্যান্ডে পড়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছিল, ওই দিনই বিষয়টি চিরতরে মীমাংসা করা হবে। তা করা হয়নি। ঝুলিয়েই রাখা হলো। বলা হয়েছে, আরো দুই ধাপে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে। এতে তারা হয়তো কিছুটা স্বস্তি পেতেও পারেন। হোসাইন আহমদ মাদানি জানিয়েছেন, তিনি ভারতীয় নাগরিক। তার দাদার জাতীয় ভোটার আইডি কার্ড ছিল, তার বাবা একটি স্কুলের শিক্ষকতা করেন।

অথচ এখন তার পরিবার নাগরিকত্বের তালিকা থেকে বাদ পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন। তথ্য যাচাই কর্মকর্তারা প্রত্যন্ত বলদমারি চরে তাদের গ্রামে কয়েকবার গেছেন, কিন্তু অনিশ্চয়তা কাটেনি বরং বেড়েছে। তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয় কি না সেই অনিশ্চয়তায় তাদের ঘুম হারাম হওয়ার জোগাড় হয়েছে। তাদের সামনে রোহিঙ্গা ইস্যু তো রয়েছেই। মায়ানমারেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিজ বাড়িতে বাস করার পর লাখ লাখ লোককে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে। গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের নির্মম পরিস্থিতির শিকার হয়েছে রোহিঙ্গারা। আসামে যা চলছে, তাতে করে তাদের মধ্যেও একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইতোমধ্যে বোড়ো উপজাতির হামলায় বহু মুসলমানের প্রাণহানি ঘটেছে। অবশ্য আসামের মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে সেই ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্তির সময় থেকে। ‘অবৈধ অভিবাসী’ তকমাটি তাদের গায়ে এঁটে রয়েছে। স্থানীয় লোকজন তাদের ওপর যখন-তখন চড়াও হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। দাঙ্গা সৃষ্টি করে সেবার মধ্য আসামের নিলিতে দুই হাজারের বেশি বাংলাভাষাভাষী মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ‘সন্দেহজনক ভোটার’ ও ‘অভিবাসী’ চিহ্নিত করে হাজার হাজার বাংলাভাষাভাষী মুসলিমকে ডিটেনশন সেন্টারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। আসামের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ ভাগ মুসলিম। অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশ থেকে হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মের লোকজনই আসামে পাড়ি দিয়েছে।

হিন্দুদের নিয়ে কোনো কথা হয়নি। তাদের বেশ সমাদরেই রাখা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে ভয়ঙ্কর খেলা। ভোটের রাজনীতি। আরো হিসাব কষা হচ্ছে হিন্দু-মুসলিম ইস্যুতে। কট্টর হিন্দুপন্থী বিজেপি চাচ্ছে রাজ্যে হিন্দুদের সংখ্যা বাড়ুক। তা হলে তাদের ভোট বাড়তে পারে। আসামের উপজাতিদের কাছে সেটা কাঙ্খিত নয়। তারা মনে করে, হিন্দুর আগমন বাড়লে একসময় তারাই হয়ে পড়বে সংখ্যালঘু। তারা হিন্দু ও মুসলিম উভয়েরই বিরোধী। ফলে মুসলমানেরা উপজাতিদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন।

আর মুসলিমরা মনে করছে, তারা বৈধ নাগরিক। আসামের রাজধানী গৌহাটির অধিকার আইনজীবী আমান ওয়াদুদ বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তালিকা করা হলে সব মুসলিমই নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন। তিনি সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানোর জন্য বিজেপিকে দায়ী করেন। এখন বলা হচ্ছে, যারা ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত আসামে ছিল, তাদের সবাইকে নাগরিকত্ব দেয়া হবে। তবে তাদের সেখানে থাকার কোনো না কোনো প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। ভোটার আইডি কার্ড, রেশন কার্ড বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদপত্র ইত্যাদি নথি দেখাতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের কাছে ক্ষমা চাইতে মাসুদা ভাট্টিকে লিগ্যাল নোটিশ

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে গ্রেফতারে ড. কামালের উদ্বেগ, আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা

ফেসবুকে লাইক দিন