কাশ্মীরের কোনও মসজিদে মাইক বাজানোর অনুমতি নেই

ইমান২৪.কম: শুক্রবারের নামাজের পরে ভারত শাসিত কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের সৌরা এলাকায় একটি বিক্ষোভ চলাকালে হঠাৎই নিরাপত্তা বাহিনী ছররা গু’লি আর কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটিয়েছে। আমি অন্তত দুজনকে আহত হতে দেখেছি। কিন্তু প্রশাসনের তরফ থেকে আহতের সংখ্যা এখনও পর্যন্ত জানানো হয় নি। ৩৫এ আর ৩৭০ ধারা বিলোপের পরে এই সৌরা এলাকাতেই প্রথম বড়সড় বিক্ষোভ হয়েছিল দুসপ্তাহ আগে শুক্রবারের নামাজের পরেই। গত শুক্রবারও নামাজের পরে একটা শান্তিপূর্ণ মিছিল হয়েছিল।

কোনও গন্ডগোল হয় নি। তাই আজকের নামাজ শুরু হওয়ার কিছুটা আগেই, বেলা একটার দিকে সেখানে পৌঁছই আমি। সঙ্গে ছিলেন সহকর্মী ক্যামেরাপার্সন নেহা শর্মা। তখন মাজারে মানুষ জড়ো হওয়া শুরু হয়েছিল। নারী আর পুরুষ – নামাজ পড়তে আসেন এখানে। প্রথম নামাজের পরে স্বাধীনতাপন্থী কিছু স্লোগান ওঠে। তারপরে একটা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু হয়। সেখানে তখন বেশ কয়েক হাজার মানুষ হাজির ছিলেন। গতসপ্তাহের মতোই আজকের বিক্ষোভ মিছিলটাও নানা অলি গলি ঘুরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু হঠাৎই একটা জায়গায় গলির ভেতরে নিরাপত্তা বাহিনী ঢুকতে চেষ্টা করে। তখনই অশান্তি শুরু হয়। এখানেই জানিয়ে দিই, নিরাপত্তাবাহিনী যাতে ভেতরে ঢুকতে না পারে, সেজন্য বড়রাস্তা থেকে যত গলি ভেতরে ঢুকেছে, সেই সব গলিগুলো খুঁড়ে রেখে দিয়েছেন, কোথাও বড় বড় ব্যারিকেড রেখে দিয়েছেন ওখানকার বাসিন্দারা। পুলিশের গাড়ি ভেতরে ঢুকতে পারে না ওখানে। ভেতরে ঢুকতে গেলে পুলিশকে হেঁটেই ঢুকতে হবে। এরকমই একটা গলি দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে একদল নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।

আর সৌরাতে একটা ব্যবস্থা আছে, যখনই পুলিশের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সং’ঘর্ষ বাঁধে, তখনই সব বাড়ি থেকে টিন বাজানো শুরু হয়ে যায়। আর সব মানুষ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সং’ঘর্ষে নেমে পড়ে। আজকেও সেরকমই ঘটনা হল। পুলিশ আর কেন্দ্রীয় বাহিনীর দলটা যেই ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল, তখনই পাথর ছোঁড়া শুরু হল একদিকে, আর অন্যদিকে সব বাড়ি থেকে টিন বাজানো হতে লাগল। সবাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওই গলিটার দিকে দৌড়তে লাগল। একদিক থেকে পাথর ছোঁড়া হচ্ছে, অন্যদিক থেকে ছররা গু’লি, কাঁদানে গ্যাস আর গোলমরিচের গোলা ছোঁড়া হচ্ছিল।

আমি দুজনকে ছররা গু’লিতে আহত হতে দেখেছি। একজনের চোখ থেকে রক্ত বেরচ্ছিল, আরেকজনের ঘাড়ে আঘাত লেগেছিল ছররা গু’লির। আজকের সং’ঘর্ষটা প্রায় ঘন্টা দুয়েক চলেছিল, বেলা চারটে পর্যন্ত। এখনও পর্যন্ত প্রশাসন নির্দিষ্ট করে আহতদের সংখ্যা জানায় নি। অন্যদিন সন্ধ্যের সময়ে একটা করে সংবাদ বুলেটিন প্রকাশ করে জম্মু-কাশ্মীর প্রশাসন। কিন্তু গতকাল আর আজ সেটা প্রকাশিত হয় নি। দুদিন ধরেই একটা পোস্টার লাগানো হয়েছিল শহরের নানা জায়গায় যে শুক্রবারের নামাজের পরে বিক্ষোভ হবে। সবাইকে আহ্বান জানানো হয়েছিল শ্রীনগরে জাতিসং’ঘের কার্যালয়ের দিকে মিছিল করে যাওয়ার জন্য। হুরিয়ত কনফারেন্সের নামে ওই পোস্টার পড়েছিল। কিন্তু জাতিসং’ঘের কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার একটি বাদে সব রাস্তাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সকাল থেকেই। সেখানে ব্যাপক নিরাপত্তার কড়াকড়ি করা হয়েছিল।

সেদিকে কোনও মিছিল যায় নি অবশ্য শেষ অবধি। তবে ওই পোস্টার যদি নাও পড়ত, তাহলেও এই সৌরা এলাকায় বিক্ষোভ হতই। এই অঞ্চলে শুক্রবারের নামাজের পরে বিক্ষোভ নিয়মিত ঘটনা। আজ যখন গোলমরিচের গোলা ছোঁড়া হয় নিরাপত্তাবাহিনীকে লক্ষ্য করে, তখন সাংবাদিকরাও তার হাত থেকে রেহাই পাই নি। ওই গ্যাস যখন নাকে ঢোকে তখন ক্রমাগত কাশি হতে থাকে। সাধারণত আমরা নিরাপত্তাবাহিনীর পেছন দিক থেকে ছবি তুলি। সেটাকেই সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ এলাকা বলে ধরা হয়। কিন্তু ৩৭০ ধারা বিলোপের পর থেকে ওইদিক থেকে আমাদের ছবি তুলতে দেওয়া হচ্ছে না।

তাই আমরা বাধ্য হচ্ছি বিক্ষোভকারীদের পিছন দিক থেকে ছবি তুলতে। আমাদের নাকেও গোলমরিচের গ্যাস ঢোকে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা লবণ আর জলের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার ফলে কিছুটা স্বস্তি পাই আমরা। সৌরাতে অশান্তি হলেও শহরের অন্যান্য অঞ্চলে কোনও বিক্ষোভ বা অশান্তির খবর নেই। বিবিসির সহকর্মী রিয়াজ মাসরুর হজরতবাল দরগা সহ শহরের নানা বড় মসজিদ ঘুরে জানাচ্ছেন আজ তৃতীয় সপ্তাহের মতো শুক্রবারের নামাজের জন্য বড় জমায়েতের অনুমতি দিচ্ছে না। সোপিয়ান, কুলগাম, বারামুল্লা, কুপওয়াড়া বা অনন্তনাগ এলাকাতেও একই ধরণের বিধিনিষেধ চালু রয়েছে।

মাইক বাজানোরও অনুমতি নেই কোনও মসজিদে। বড় মসজিদগু’লিতে শুক্রবারের নামাজের জমায়েতের অনুমতি না থাকলেও এলাকার ছোট ছোট মসজিদগু’লিতে নামাজ পড়তে কোনও বাধা নেই। কদিন ধরেই নিরাপত্তার কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল করা হচ্ছিল, কিন্তু শুক্রবারের নামাজের পরে বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়ে যে পোস্টার পড়েছিল, তার প্রেক্ষিতেই প্রশাসন আজ আবারও কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কিন্তু প্রশাসন এটাও বলছে যে আগামী কাল থেকে আবারও কড়াকড়ি শিথিল হবে।

ফেসবুকে লাইক দিন