🌿ইসলামে শিশু-কিশোরদের অধিকার🌿

মানব জীবনের সূচনালগ্নে একজন মানুষকে শিশু বলা হয়। আমরা প্রত্যেকে এক সময় শিশু ছিলাম। শিশু-কিশোর বলতে আমরা বুঝি বয়সের স্বল্পতার কারণে যাদের দেহ, মন ও মগজ পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়নি। আজকের শিশু আগামী প্রজন্মের নাগরিক। আজ যারা ছোট, কাল তারা হবে বড়। ভবিষ্যতে তারাই হবে সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধার।

একজন মানব শিশু যখন কথা বলতে পারে না, নিজে খেতে পারে না, নিজের পায়ে চলতে পারে না, নিজের ভাল-মন্দ বুঝে না সে সময় থেকে শুরু করে কিশোর বয়স পর্যন্ত তাদের প্রতি ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সাংগঠনিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কিছু হক্ব বা অধিকার রয়েছে। এটাই শিশু-কিশোরদের অধিকার। অন্যদিকে সোনামণিরা যাতে মনে-প্রাণে কষ্ট না পায়, বুদ্ধিতে বাঁধাপ্রাপ্ত না হয়, দেহের বৃদ্ধি ও মেধা বিকাশে বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়-এরূপ আচরণ করার নামই ‘সোনামণি অধিকার’।

তাই আজকের শিশু-কিশোরেরা অনাদর ও অবহেলায় অধিকার বঞ্চিত হয়ে বড় হলে ভবিষ্যতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নেমে আসবে চরম অশান্তি ও বিশৃংখলা। অথচ সোনামণিদের অধিকার রক্ষায় প্রায় দেড় হাযার বছর আগে মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) ইসলামের সুমহান জীবনাদর্শের মধ্যে শিশু-কিশোরদের জন্য রেখে গেছেন অধিকার সম্বলিত একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা।

ইসলামে শিশু-কিশোরদের উপর সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার এবং নির্যাতন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উৎসাহ দিয়েছে নিরাপদ পরিবেশে জীবন-যাপন করার। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীস এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে ‘সোনামণি বা শিশুদের অধিকার’ বিষয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

ইসলামে শিশু-কিশোরদের অধিকারঃ

১। সন্তান যেন আল্লাহর ওলী হয় এই ধ্যান-ধারনা রেখে পূর্বে থেকেই একজন দ্বীনদার নারীকে বিবাহ করা।

২। সন্তান জন্মগ্রহনের পর সুন্দর নাম রেখে কোন বুজুর্গ ব্যক্তির দ্বারা তাহনীক (নিজ মুখে খেজুর চিবিয়ে বাচ্চার মুখে দেওয়া) করিয়ে নিবে। অতঃপর আক্বীকা করবে। যা সপ্তম দিনে করা ভাল। তবে পরেও করা যায়।
তাহনীক হচ্ছে কোন আলিম বা তাক্বওয়াশীল ব্যক্তি কর্তৃক খেজুর কিংবা মধু বা মিষ্টি জাতীয় কোন বস্ত্ত চিবিয়ে স্বীয় লালা মিশ্রিত করে নবজাতক শিশুর মুখে দেওয়া।

আয়েশা (রাঃ) বলেন, كَانَ يُؤْتَى بِالصِّبْيَانِ فَيُبَرِّكُ عَلَيْهِمْ وَيُحَنِّكُهُمْ. ‘রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে নবজাতক শিশুকে নিয়ে আসা হত। তিনি তাদের জন্য কল্যাণ ও বরকতের দো‘আ করতেন এবং তাদেরকে তাহনীক করতেন’ ।

৩। বয়স হলে তাকে দ্বীনের তালীম দিবে। ইংরেজি শিক্ষা ওয়াজিব নয়। কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর তালীম দেয়া ফরজ। ইংরেজি শিক্ষা যদি হালাল রিযিক কিংবা দ্বীনের দাওয়াতের জন্য হয়, তাহলে জায়েয আছে। তবে ইংরেজি শিখতে গিয়ে ইংরেজ হয়ে গেলে চলবে না।

৪। ছেলে-মেয়ে বালেগ হলে তাদেরকে দেখে শুনে দ্বীনদার পাত্র-পাত্রীর সাথে বিবাহ দিয়ে দেয়া।

৫। মমতাপূর্ণ আচরণ : প্রেক্ষিত ইসলাম

ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান আল্লাহর দেওয়া বিশেষ নেয়া‘মত ও অনুগ্রহ। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,

وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَجَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ بَنِينَ وَحَفَدَةً وَرَزَقَكُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ أَفَبِالْبَاطِلِ يُؤْمِنُونَ وَبِنِعْمَتِ اللَّهِ هُمْ يَكْفُرُونَ

‘আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তোমাদের থেকে তোমাদের জোড়া এবং সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জোড়া থেকে তোমাদের পুত্র ও পৌত্রদের আর রিযিক দিয়েছেন তোমাদের উত্তম বস্ত্ত থেকে। তবুও কি তারা বাতিলকে বিশ্বাস করবে এবং আল্লাহর নে‘মত অস্বীকার করবে’? (নাহল ১৬/৭২)।

সুতরাং সন্তান আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে বিশ্ব মানবতার জন্য এক বিশেষ দান ও পৃথিবীর সৌন্দর্যের প্রতীক।

ইসলাম শিশু-কিশোরদের অনেক অধিকার দিয়েছে। তাদের জন্ম থেকে শুরু করে জীবন চলার পথে আরো অনেক অধিকার সেখানে স্বীকৃত।

শিশু কিশোরদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আচরণ ছিল অধিক মমতাপূর্ণ। তিনি স্বস্নেহে ও সোহাগভরে ইসলামী সকল প্রকার আদব-কায়েদা তাদের শিক্ষা দিতেন। তিনি তাদের দেখলে খুব খুশী হতেন। তাদের নিকটে যেতেন, সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করতেন, খোঁজ-খবর নিতেন, মাথায় হাত বুলাতেন, কোলে নিতেন, কাঁধে উঠাতেন, আদর-স্নেহ করতেন, খুব ভালবাসতেন। এমনকি চুমু খেতেন এবং দো‘আ করতেন। তাদের সাথে তিনি আকর্ষণীয়, রসাত্মক ও উপদেশমূলক কথা বলতেন। আবার কিছুটা হাসি-কৌতুকও করতেন। তিনি খাবারে তাদের অংশীদার করতেন, দৌড় প্রতিযোগিতা করাতেন। পথে দেখা হলে নিজের বাহনে চড়াতেন। ভুল করলে ক্ষমা করে সঠিক জিনিসটা বুঝিয়ে দিতেন। তিনি তাদের বকাবকি, মারপিট ও মুখে আঘাত করতে নিষেধ করেন।

ইসলাম শিশু-কিশোরদের জন্ম থেকে তাদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার। সোনামণিদের জন্মোত্তর অধিকার সমূহের মধ্যে নিমেণাক্ত অধিকারগুলো প্রণিধানযোগ্য :

৬। কানে আযান শুনার অধিকার : সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথেই তাদের পিতামাতা ও অভিভাবকদের প্রতি কতগুলি কর্তব্য রয়েছে। আবু রাফে‘ (রাঃ) বলেন,

رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَذَّنَ فِى أُذُنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِىٍّ حِينَ وَلَدَتْهُ فَاطِمَةُ بِالصَّلاَةِ .

‘ফাতিমা (রাঃ) যখন হাসান ইবনে আলী (রাঃ)-কে প্রসব করলেন তখন আমি রাসূল (ছাঃ)-কে ছালাতের আযানের ন্যায় তার কানে আযান দিতে দেখলাম।

৭। বিসমিল্লাহ’ বলে শিশুকে দুধ পান করানো : শিশুর আদর্শ খাবারের মধ্যে মায়ের দুধ অন্যতম। মায়ের দুধের বিকল্প ও সমকক্ষ আর কিছু নেই। তাই শিশুর শারীরিক ও মানসিক যথাযথ বিকাশের জন্য মায়ের দুধের শক্তি অন্যতম উপাদান। এক্ষেত্রে অলসতা ও অবহেলা করা কোন ক্রমেই উচিৎ নয়। মহান আল্লাহ শিশুর জন্য মায়ের দুধ পান করানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ বলেন, وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ ‘মাতাগণ তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে, যারা দুধ পানের মেয়াদ পূর্ণ করতে চায়’ (বাক্বারাহ ২/২৩৩)।

শিশুকে দুধ পান করানোর সর্বোচ্চ সময়সীমা আড়াই বছর। এরপর তাকে স্বাভাবিক খাদ্য খেতে দিবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, মায়ের দুধ শিশুদের মেধা বিকাশে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। একজন শিশুর দুই-আড়াই বছরের জন্য অন্যতম নে‘য়ামত হচ্ছে তার মায়ের বুকের দুধ।

শিশুকে দুধ পান করানোর সময় এবং খাদ্য প্রদানের সময় বিসমিল্লাহ বলে দেয়া পিতা-মাতার কর্তব্য। হুযায়ফাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘শয়তান সেই খাদ্যকে নিজের জন্য হালাল করে নেয় যে খাদ্যে বিসমিল্লাহ বলা হয় না’। আসুন, আমরা দুধ পান করানোর দায়িত্ব পালনে মায়েদেরকে সার্বিক সহযোগিতা করি।

৮। সন্ধ্যার সময় শিশুকে বাড়ীর বাইরে নিয়ে যাওয়া যাবে না : সন্ধ্যার পর শিশুকে বাড়ীর বাইরে বা ছাদের উপরে নিয়ে না যাওয়া বা যেতে না দেওয়া উচিত। কারণ এ সময় শয়তান বিষাক্ত পোকা-মাকড় আহার করার জন্য বের হয় এবং শিশুদের ক্ষতি করে।

জাবির (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন সন্ধ্যা হয়, তখন তোমরা তোমাদের শিশুদেরকে বাড়ির বাইরে যেতে দিও না। কারণ সেই সময় শয়তান ছড়িয়ে পড়ে…।

অন্য বর্ণনায় আছে, وَاكْفِتُوا صِبْيَانَكُمْ عِنْدَ الْعِشَاءِ فَإِنَّ لِلْجِنِّ انْتِشَارًا وَخَطْفَةً ‘আর সন্ধ্যার সময় তোমাদের শিশুদেরকে ঘরের ভিতরে আবদ্ধ রাখ। কেননা এ সময় জিনেরা ছড়িয়ে পড়ে এবং (শিশুদের) ছিনিয়ে নেয়।

৯। মানুষের জন্য সর্বপ্রথম ফরয হল লজ্জাস্থান আবৃত করা বা পোশাক পরিধান করা। মানুষ ও জন্তু-জানোয়ারের মধ্যে পার্থক্য হল পোশাক। ইসলামে পুরুষ ও মহিলাদের পোশাকের ব্যাপারে পৃথক পৃথক নীতিমালা বর্ণিত হয়েছে। তাই আমাদের সোনামণিদেরকে শালীনতা যেন বজায় থাকে এমন ধরনের উত্তম পোশাক পরিধান করাতে হবে।

মহান আল্লাহ বলেন, يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ ذَلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ

‘হে আদম সন্তান! আমি তোমাদের জন্য অবতীর্ণ করেছি এমন পোশাক যা তোমাদের লজ্জাস্থানকে আবৃত করে ও অবতীর্ণ করেছি সাজ-সজ্জার পোশাক এবং পরহেযগারীর পোশাক (তাক্বওয়ার পোশাক)। এটা সর্বোত্তম (পোশাক)। আর এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নির্দেশনা, যাতে তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর’ (আ‘রাফ ৭/২৬)।

এ আয়াতে পোশাকের ৩টি গুণের কথা বলা হয়েছে। যথা : (১) তাক্বওয়া বা পরহেযগারিতার পোশাক (২) যা লজ্জাস্থানকে আবৃত করে (৩) সাজ-সজ্জার পোশাক। এ আয়াতটি বিশ্ব মানবতার জন্য, শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য নয়। পোশাক আঁটসাট, ছোটখাটো ও ফিটফাট হবে না। পোশাক তুলনামূলক ঢিলেঢালা ও লম্বা হবে; যা শরীর ঢেকে রাখে ও ভদ্রতার পরিচয় দেয়। আর এ বিষয়ে পিতা-মাতাসহ অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে।

অন্যদিকে মহান আল্লাহ বলেন, يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

‘হে আদম সন্তান! তোমরা প্রত্যেকটি ইবাদতের স্থানে (ছালাতের সময়) সুন্দর পোশাক পরিধান কর। আর খাও ও পান কর কিন্তু অপচয় করনা। কেননা আল্লাহ অপচয়কারীকে ভালবাসেন না’ (আ‘রাফ ৭/৩১)।

সুতরাং পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশিত পোশাক পরিধানে সোনামণিদেরকে অভ্যস্থ করে গড়ে তোলা।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে উল্লেখিত বিষয়ের ওপর আমল করার তৌফিক দান করুন।
“””””””””””””””””””””””””আমীন”””””””””””””””””””””

ফেসবুকে লাইক দিন