ইসলামি চিন্তাবিদ অধ্যাপক শাহেদ আলীর ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা

ইমান২৪.কম: অধ্যাপক শাহেদ আলী (১৯২৫-২০০১) একজন ভাষা সৈনিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও ইসলামী চিন্তাবিদ। তিনি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় মাহমুদপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯২৫ সালের ২৪ মে জন্মগ্রহণ করেন। শাহেদ আলী সিলেটের এম.সি কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে স্নাতক ডিগ্রি ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যাপক হিসেবে ১৯৫১ সালে শাহেদ আলী তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীকালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ, মিরপুর বাংলা কলেজ এবং ঢাকার আবুজর গিফারী কলেজে কর্মরত ছিলেন। সমমতাদর্শীদের নিয়ে তিনি ১৯৪৮ সালে তমুদ্দুন মজলিস গঠন করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন ও পরবর্তীকালে এর সভাপতি হন। শাহেদ আলী সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলন এ অংশগ্রহণ করেন। খেলাফতে রববানী পার্টির টিকেটে তিনি ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সভার সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি আইন সভার সদস্য ছিলেন। ১৯৬০ সালে যখন ইসলামিক একাডেমী (পরবর্তীকালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন) প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তিনি এর সচিব নিযুক্ত হন এবং বিভিন্ন পদে বিশ বছর উক্ত সংগঠনে নিয়োজিত থেকে অবশেষে অনুবাদ ও সংকলন বিভাগের পরিচালক হন। শাহেদ আলী পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন, যার মধ্যে তিনি প্রশংসিত হয়েছেন তাঁর উপন্যাস হূদয় নদী (১৯৬৫) এবং ছয়টি গল্প গ্রন্থ জিবরাইলের ডানা (১৯৫৩), একই সমতলে (১৯৬৩), শা’নযর (১৯৬৫), অতীত রাতের কাহিনী (১৯৮৬), অমর কাহিনী (১৯৮৭) এবং নতুন জমিদার-এর (১৯৯২) জন্য। তবে ‘জিবরাইলের ডানা’ গল্পগ্রন্থের জন্য তাঁর বেশি খ্যাতি। তাঁর একমাত্র নাটিকা বিচার (১৯৮৭) নাট্যমহলে সমাদৃত হয়। ১৯৪৮ সাল থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সৈনিক (ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শাহেদ আলী ঢাকা ও কলকাতার সাময়িকীতে লিখতেন। ১৯৪০ সালে তিনি যখন মাত্র অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যায়নরত, তখন তাঁর প্রথম গল্প ‘অশ্রু’ মাসিক সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি প্রভাতী (১৯৪৪-৪৬), দৈনিক বুনিয়াদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন গবেষণা পত্রিকা, মাসিক সবুজ পাতা (শিশুতোষ) এবং আল্লামা ইকবাল সংসদ গবেষণা পত্রিকারও সম্পাদক ছিলেন।

ধর্ম ও সংস্কৃতিবিষয়ক তাঁর কিছু গ্রন্থ- ছোটদের ইমাম আবু হানিফা, তরুণ মুসলিমের ভূমিকা (১৯৪৬) একমাত্র পথ (১৯৪৬), তরুণের সমস্যা, তাওহীদ, মুক্তির পথ, বুদ্ধির ফসল আত্মার আশিস, ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা, মক্কার পথ (মূল : মুহাম্মাদ আসাদ), ইসলামে রাষ্ট্র ও সরকার (মূল : আল্লামা আসাদ) ইত্যাদি। শাহেদ আলী বেশ কয়েকটি সম্মাননা, পুরস্কার ও পদক লাভ করেন। যেমন, বাংলা একাডেমী সম্মাননা (১৯৬৪), তমঘা-ই-ইমতিয়াজ (১৯৬৯), একুশে পদক (১৯৮৯) ইত্যাদি। শাহেদ আলীর মৃত্যু হয় ৭৬ বৎসর বয়সে ২০০১ সালে। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শাহেদ আলীর ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর জবানি পড়ি- “আমি তখন বগুড়া কলেজের অধ্যাপক। উর্দুভাষী এ জি হক কলেজের প্রিন্সিপাল। ঢাকার গুলিবর্ষণের খবর, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশের হামলার খবর এলো দাবানলের মতো। আরো খবর রটে গেল গাজীউল হক মারা গেছেন। এ খবর পেয়ে শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা নষ্ট এবং গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে আমরা উডবার্ন সিনেমা হলে প্রতিবাদ সভা ও মিছিলের আয়োজন করলাম।

উর্দুভাষী প্রিন্সিপাল এ জি হক প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন। সরকারের কঠোর সমালোচনার মাধ্যমে সভাশেষে প্রতিবাদ মিছিল শুরু হয়। কিন্তু সেদিনও অধ্যাপকদের অনেকে মিছিলের পুরোভাগে থাকতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। পরিশেষে আমি, বদরুজ্জামান, জহিরুদ্দিন, শামসুল হুদা এ কজন পুরো ভাগে থেকে প্রতিবাদ মিছিল পরিচালনা করি। তখন কলেজের ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছাত্রনেতা ছিলেন তৌফিকুল আলম খান।… পরদিন আমার নামে তলব এল। বলা হল ডিসির সাথে দেখা করতে। দেখা করতে গেলাম। ডিসি বললেন- আমি জানতে পেরেছি এখানে যা কিছু ঘটছে সবই আপনার তৎপরতার জন্য। আমি বললাম- সারাদেশব্যাপী যা ঘটছে তাতে আমার কি হাত আছে? সবই স্পন্টিনিয়াসলি হচ্ছে। আমি যদি এর জন্য দায়ী হতাম তাহলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতাম। এরপর ডিসি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন- আলতাফুননেছা ময়দানে মিটিং হচ্ছে তা আপনাকে বন্ধ করতে হবে। আমি বললাম- আমি কেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে অনুষ্ঠিতব্য মিটিং বন্ধ করতে যাব?

ডিসির সাথে আলোচনাযর সমাপ্তি টেনে আমি ফিরে এলাম।” অধ্যাপক শাহেদ আলী ভাষা আন্দোলনের একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। ভাষা আন্দোলনের গোড়ার দিকে প্রতিকূল পরিবেশে যারা নির্ভীক ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি তাদের অন্যতম। তিনি তমুদ্দুন মজলিসেরও নিরলস সংগঠক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র ‘সৈনিক’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি যে সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেন, আমাদের জাতীয় ইতিহাসে তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তথ্য ঋণ: ১. ভাষা আন্দোলন সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন, মোস্তফা কামাল, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিঃ, দ্বিতীয় প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭, পৃ.১০০-১০০৭ ২. ভাষা সংগ্রামীদের কথা: বৃহত্তর সিলেট, তাজুল মোহাম্মদ, সাহিত্য প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৭, পৃ. ১৩৭-১৩৮ ৩. বাংলাপিডিয়া ৪. উইকিপিডিয়া

আরও পড়ুন: গরুর ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না: নরেন্দ্র মোদি

বাংলাদেশের পদ্মার মা ইলিশ সরিয়ে নিতে ভারতের নতুন 

ফেসবুকে লাইক দিন