বঙ্গবন্ধু তাওহীদ ভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েমের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন

ইমান২৪.কম: শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দৈনিক ভোরের পাতার নিয়মিত আয়োজন ভোরের পাতা সংলাপে ‘ধর্মে কর্মে বঙ্গবন্ধু’-৩য় পর্বে এ বিষয়ে বিস্তর কথা বলেন বিজ্ঞ আলোচকরা। আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন দারুন নাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদরাসার প্রধান মুফতি ওসমান গণী সালেহী, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আশরাফুল আলম। দৈনিক ভোরের পাতার সম্পাদক ও প্রকাশক ড. কাজী এরতেজা হাসানের গ্রন্থনা ও নির্দেশনায় অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক ছিলেন মিরাজ রহমান।

মুফতি ওসমান গণী সালেহী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের সাথে আলেম-ওলামাদের সাথে সম্পর্ক এবং ইসলামের মূল্যবোধের ক্ষেত্রে তিনি সে সময় আলেম-ওলামাদের সাথে সহচর্য লাভ করেছিলেন এই বিষয় নিয়ে আজ আমরা কথা বলবো।

আমি প্রথমেই বলে নেই যে, আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখি নাই, আমি যদি তাকে দেখতে পারতাম তাহলে দেখার যে কি অনুভূতি, তার যে জৌলসময় বক্তব্য, সেটা আসলে আমার সৌভাগ্য হয়নি। পবিত্র কোরআন পাকে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, “হে ঈমানদার বান্দাগন তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আর তোমরা যারা সত্যবাদী তাদের সহচর্য তোমরা আগ্রহন করো।” এই আয়াতে কারিমাকে কেন্দ্র করে আমরা যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আলেম-ওলামাদের সাথে একটি তায়াল্লুক বা সম্পর্ক ছিল তা বিশ্লেষণ করতে গেলে আমি প্রথমেই বলতে চায়, তিনি ছিলেন মুসলিম।

আমি এই কথাটি শুরুতেই এই জন্যই বলছি কারণ, অনেক আলেম-ওলামারা তাদের বক্তব্যের সময় অনেক জজবার ঠেলায় বা আবেগে ইনশাআল্লাহ কথাটি ভুলে যায়। কিন্তু আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন তার বক্তব্যে বজ্রময়ি কণ্ঠে যখন বলেছিলেন, এই দেশকে স্বাধীন করে ছাড়বোই ইনশাআল্লাহ। তার এই ইনশাআল্লাহ শোনার পর কিন্তু বাংলার মানুষরা চুপ করে থাকে নাই। তার হৃদয় থেকে তিনি তখন বলেছিলেন ইনশাআল্লাহ; যার অর্থ যদি আল্লাহ‌ পাক চান। এই যে বিশ্বাস, এই বিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করলেই বুজা যায় তিনি একজন সাচ্চা মুসলমান ছিলেন।

হক্কানি আলেম, ওলামা, পীর মাসায়েখ, বুজরগানে দ্বীনদের সাথে তার যে একটি সম্পর্ক ছিল। আমরা যদি তার পারিবারিক ও ব্যক্তিগত ভাবের দিক থেকে দেখি আলেম-ওলামাদের সাথে তার সম্পর্ক ছিল অনেক আগে থেকেই। সে যুগের যারা বড় বড় স্কলার ছিলেন, খ্যাতনামা আলেম ছিলেন তার মধ্যে মুফতি আমিনুল ইহসান (রহমতুল্লাহ আলাইহি) এর কথা আমরা জানি। তিনি ছিলেন এখন মস্তবড় আলেম। তাছাড়াও আমাদের সবার প্রিয় ও পরিচিত মুখ মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী (রহমতুল্লাহ আলাইহি)। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এত বেশী শ্রদ্ধা করতেন, এতো বেশী মহব্বত করতেন যে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পিতার সমতুল্য মনে করতেন। একজন বাবা যেমন তার সন্তানের শিক্ষা দীক্ষার দিকে যেমন যত্নবান হন ঠিক তেমনি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীও কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কিভাবে গড়ে তুলতে হয়, কিভাবে একজন যোগ্য নেতা বানানো যায়, কিভাবে জাতির খেদমতে নিজেকে কাজে লাগানো যায় এই শিক্ষায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে শিখিয়েছিলেন। এজন্যই বহু যুবকের মধ্য থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্বাচন করেছিলেন কারণ মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী বুজতে পেরেছিলেন ইনিই হবে ভবিষ্যতের দেশ ও দশের কাণ্ডারি।

প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আশরাফুল আলম বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন বাংলাদেশের মত একটি রাষ্ট্রকে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে উপহার দিতে পেরেছিলেন দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন খাটি মুসলমান ছিলেন। তিনি দরবেশ শেখ আব্দুল আওয়াল যিনি বাগদাদ থেকে এইদেশে ইসলাম প্রচার করতে এসেছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সেই শেখ আব্দুল আওয়ালের সপ্তম বংশধর।

যার থেকে আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন আদর্শ পর্যালোচনা করে দেখেছি, উনি ছিলেন একজন সূফী বংশের খাস ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আদর্শে অনুপ্রাণিত একটি বংশের একজন মহাপুরুষ। যার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চের ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।” এই বক্তব্যেই আমরা বুঝতে পারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অধিকার আদায়ে যে মুক্তির আন্দোলনে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে উচ্ছ্বাসিত করেছিলেন। তখন যে শুধু দেশীয়ভাবে, সামাজিক ভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাবে নয়। তিনি মানুষকে আল্লাহপাকের আদর্শে, রাসুল (সা.) এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাওহীদ ভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েমের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। যার কারনেই ইনি এই ভাষণের শেষে বলেছিলেন ইনশাআল্লাহ। যার অর্থ ছিল, যদি আল্লাহ্‌ চায় তাহলে এদেশের মানুষকে মুক্ত করবো।

এটা কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে এই বক্তব্য দেওয়া সম্ভব ছিলনা। মাঝে মধ্যে একটি কথা শোনা যায়, মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধুর সাথে সম্পর্কের অবনতি ছিল যা ছিল একটি কুচক্রী মহলের চক্রান্ত। যেকোনো কারণেই হোক না কেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের সাথে সৌদি আরব বা আরব আমিরাতের মত এই ধরনের অনেক রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে অনুসরণ না করে তারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। সৌদি আরব, জর্ডান, মরক্কো, লিবিয়া, পাকিস্তান একছিল। কিন্তু যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায় তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এইসকল দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে এক মধুর সম্পর্ক গড়ে তুলেন, যার কারণে সৌদি সহ সারা বিশ্বের অনেক দেশই তখন এই বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

ইয়াসিন আরাফাত ও গাদ্দাফির সাথে বঙ্গবন্ধুর সাথে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। বঙ্গবন্ধু তাদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন। বঙ্গবন্ধু তাদেরকে বুজাতেন যে, “আমি একজন মুসলমান, আমি কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারিনা। আমি আল্লাহর বলার পথে, রাসুল (সা.) এর আদর্শ মত সিদ্ধান্ত নিব।” এই কারণেই মুসলিম বিশ্বের মানুষরা তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আপন ভাইয়ের মত গ্রহণ করেছিল। আমরা এতক্ষণ যে ইসলাম প্রচার ও প্রসার নিয়ে বঙ্গবন্ধুর এতো কথা বললাম কিন্তু তিনি যে জাতির জন্য ছিলেন, গোটা পৃথিবীর মানুষের জন্য ছিলেন একজন একক নেতা। তিনি তার ভাষণে বলেছিলেন, এই বাঙলার যে হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙ্গালির সবার জানমালের নিরাপত্তা আমাদের গ্রহণ করতে হবে। আমি আমার পার্টির নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছি এই বাঙলার যত হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙ্গালি জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকলের দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে।

ফেসবুকে লাইক দিন