ইসরাইলের হিংস্রতার বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র ১৩ সংগঠন

ইমান২৪.কম: অবরুদ্ধ গাজার অর্থনীতে অব্যাহতভাবে অবরোধ আরোপ করছে ইহুদীবাদী ইসরাইল। শাসকগোষ্ঠী হামাসের অবস্থান লক্ষ্য করে চালিয়ে যাচ্ছে একের পর এক হামলা। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে গাজার উপর চলমান সর্বাত্মক আবরোধ প্রতিহতে নিজেদের সংগ্রামও জোরদার করেছে ফিলিস্তিনিরা। এ অবস্থায় গাজায় নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সবশেষ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে হামাসের সামরিক অবস্থানে বিমান এবং ট্যাংক থেকে হামলা চালায় ইসরাইল।

দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গাজা থেকে দক্ষিণ ইসরাইল লক্ষ্য করে আগুনবেলুন নিক্ষেপের জবাবে এ হামলা চালানো হয়েছে। টানা ১৬ দিন ধরে হামাসের সামরিক স্থাপনা এবং গাজার কৃষিজমি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেল আবিব। বুধবার, আগেরদিনের হামলার প্রতিবাদে পাল্টা কোনো জবাব দেয়নি গাজার প্রতিরোধকারীরা। গেলো সপ্তাহে হামলার জবাবে ইসরাইল লক্ষ্য করে রকেট নিক্ষেপ করেছিল স্বাধীনতাকামীরা। মঙ্গলবারের হামলায় কেউ হতাহত হয়েছে কী না তা জানা যায়নি।

২০০৭ সাল থেকে গাজায় আরোপ করা অবরোধ প্রত্যাহারে ইসরাইলের উপর চাপ তৈরি করতে গেলো দু’সপ্তাহ ধরে দেশটির দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে বেলুনবোমা নিক্ষেপ করছে প্রতিরোধকারীরা। এর জেরে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার পক্ষগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের বিরোধ চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। বেলুন এবং ঘুড়িবোমা থেকে মাঝে মাঝে ইসরাইলি কৃষকদের ফসলি জমিতে আগুন ধরছে। গেলো দু’বছর আগে গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন নামে ভূমি পুনরুদ্ধার আন্দোলন শুরু করে ফিলিস্তিনিরা।

তাদের বিক্ষোভে চাপে পরে মিশর, কাতার এবং জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় গাজা-ইসরাইলের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতাও হয়। গাজার উপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করবে ইসরাইল। ইসরাইল সীমান্তের গাজা অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে শাসকগোষ্ঠী হামাস। কিন্তু ফিলিস্তিনি নেতারা বলছেন, এ সমঝোতা বাস্তবায়নেও দরকষাকষি করছে তেল আবিব। ফিলিস্তিনের গণমাধ্যমগুলো বলছে, জলসীমা উন্মুকরণ, নতুন গ্যাস লাইন নির্মাণ, গ্যাস চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, পণ্য পরিবহনের সুবিধাসহ গাজাবাসীকে দেয়া কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি ইসরাইল। বরং বেলুন নিক্ষেপের জেরে গাজার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে তেল আবিব।

সীমান্ত দিয়ে পণ্য পরিবহন, মাছ ধরার জলাশয়, জ্বালানি সরবরাহসহ একমাত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও বন্ধ করে দিয়েছে ইহুদিবাদী ইসরাইল। বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের কারণে দিনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছে গাজাবাসী। রাজনৈতিক বিশ্লেষক হুসাম আল দাজানি আল জাজিরাকে বলেন, বর্তমান উত্তেজনা গাজার পক্ষগুলো বনাম ইসরাইলের মধ্যে। গাজার সংগঠনগুলো চাচ্ছে অবরোধ প্রত্যাহার করা হোক। ইসরাইল চাচ্ছে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অবরোধ স্থায়ী করে রাখতে। ফিলিস্তিনিদের অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি আমলে না নিয়ে ইসরাইল উল্টো অরোধ কড়াকড়ি করার পাশাপাশি গাজার সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। আগ্রাসী পদক্ষেপের মাধ্যমে ইসরাইল পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করছে। পরিস্থিতিকে আরো অস্থির এবং খারাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সংকটের কারণ উদঘানের মাধ্যমে সমধান করতে হয়। সংকট বাড়িয়ে কখনো সমাধান করা যায় না। বলেন, হুসাম। ‘গাজার-ইসরাইলের অচলাবস্থা সামরিক পদেক্ষেপ ডেকে আনতে পারে’। হুসাম বলেন, এখন গাজার বিরুদ্ধে আরেকটি সামরিক অভিযানের হুমকি দিচ্ছে ইসরাইল। আশ্চর্যের বিষয় গাজায় আরোপ করা অবরোধ শিথিলের কোনো চিন্তাই করছে ইহুদিবাদীরা। বরং তারা সামরিক অভিযানকে বিকল্প হিসেবে ভাবছে। হামাসের কর্মকর্তা বাসেম নাইম আল জাজিরাকে বলেন, পরিস্তিতিকে বিস্ফোরণ থেকে রক্ষায় সহযোগিতা না করে, ইসরাইল ধীরে ধীরে গাজায় দখলদারিত্ব বাড়াচ্ছে। তারা পূর্বের চুক্তির কোনো শর্তই মেনে চলছে না।

গাজার ফিলিস্তিনিরা অসহনীয় দুর্দশার মধ্যে বেঁচে আছে। গাজার সবপক্ষ মধ্যস্থতাকারীদের বলে দিয়েছে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তারা আর চুপ করে থাকবে না। গাজার সশস্ত্রযোদ্ধারা এবং ইসরাইল বাহিনী এখন সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। তারা আরেকটি যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হামাস জানিয়েছে, গাজাকে মুক্ত করা ছাড়া এবার তারা কোনো ধরনের সমঝোতায় যাবে না। দখলদারিত্ব বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে রোববার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে আয়রন ডোম মোতায়েন বাড়িয়েছে ইসরাইল। গাজার বেলুন নিক্ষেপকারী দলের সংগঠনটি শনিবার জানিয়েছে, গাজার অবরোধ প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার বাস্তবায়নের আগে তারা ক্ষান্ত হবে না, ফিরে যাবে না।

অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিতে একাট্ট গাজার সবপক্ষ শুক্রবার ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনকারীদের সংগঠন জয়েন্ট চেম্বার অব দি প্যালেস্টাইন রেসিসটেন্স ফ্যাকশন এক বিবৃতি দিয়েছে। যাতে ১৩টি সশস্ত্র দল অন্তর্ভুক্ত। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে আধিপত্য বিস্তারে শত্রুদের কখনোই সুযোগ দেবো না। অবরোধ প্রত্যাহার আমাদের বৈধ দাবি। আমরা আমাদের অধিকার রক্ষা করবো। বেলুনবোমা নিক্ষেপে হামাস এবং ইসলামি জিহাদ সহায়তা করছে বলে অভিযোগ করেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিইয়ামিন নেতানিয়াহু। হুমকি দিয়েছেন বেলুনবোমা বন্ধ না হলে গাজার সঙ্গে আরেকটি যুদ্ধের সম্ভাবনা রয়েছে। ২০০৭ সালে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয় হামাস।

তারপর থেকেই উপত্যকায় অবরোধ আরোপ করে রেখেছে ইসরাইল। অবরোধের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাজার বাসিন্দারা। দরিদ্রতার হার দাঁড়িয়েছে ৫৩ শতাংশ। যেখানে ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ হলেই তীব্র দুর্ভিক্ষ বলে বিবেচনা করা হয়। প্যালেস্টাইন সেন্ট্রাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্স (পিসিবিএস) এ তথ্য জানিয়েছে। পিসিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী গাজার ৬৮ শতাংশ পরিবার পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবেস্থা করতে পারে না। ৮০ শতাংশ স্থানীয় বাসিন্দাকে ত্রাণের উপর নির্ভর করতে হয়। সেখানে বেকারত্বের হার ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ।

ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট ফর দি লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনের জ্যেষ্ঠ সদস্য তালাল আবু জারিফা বলেন, ইসরাইল চাচ্ছে অবরোধ আরোপ করে আমাদের চুপ করিয়ে রাখতে। ফিলিস্তিন তাদের এ পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে। জারিফা বলেন, দখলদার বাহিনী কর্তৃক সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া, মাছ ধরতে না দেওয়ার সর্বাত্মক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। গাজায় যে নির্মমতা হচ্ছে তার জন্য দায়ী দখলদার ইসরাইল। গাজার উপর আরোপ করা অবরোধ প্রত্যাহার এবং বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে চালানো নিষ্ঠুরতা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিৎ ইসরাইলের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করা। বলেন আবু জারিফা।

ফেসবুকে লাইক দিন