আওয়ামী লীগ নিজ দলের সাংসদের অত্যাচারে পিষ্ঠ

ইমান২৪.কম: ময়মনসিংহ সদর হাসপাতালে দুই মাস ধরে চিকিৎসাধীন ফারুক মিয়া। তাঁর দুই পা ভেঙে তিন টুকরা করা হয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ফারুক নিজের সুস্থতার চেয়ে বাড়ি ফেরা নিয়ে বেশি শঙ্কায়। রড, হকিস্টিক দিয়ে বেধড়ক পিটুনির পর স্থানীয় সাংসদ ফাহমি গোলন্দাজের অনুসারীরা জানিয়ে দিয়েছেন, বাড়ি ফিরলে আবার পেটানো হবে। ৪০ বছর বয়সী ফারুকও সরকারি দল আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। ফারুক মিয়া বলেন, তিনি ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেনের অনুসারী। গত ১২ আগস্ট রাতে তাঁকে পেটানোর কারণ ছিল, তিনি ময়মনসিংহ শহর থেকে জাতীয় শোক দিবসের পোস্টার গফরগাঁও নিয়ে গিয়েছিলেন। দলীয় নেতা মোয়াজ্জেমের সঙ্গে সাংসদ ফাহমি গোলন্দাজের রাজনৈতিক বিরোধ আছে। ফারুকের ঘটনার সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নেমে যেন এক ভীতসন্ত্রস্ত ও নিপীড়িত জনপদের সন্ধান পাওয়া গেল। দলের সাংসদের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে গত পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে এমন কয়েক শ পরিবার গফরগাঁও ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

অত্যাচার, নির্যাতনের পরও যাঁরা নিজের ভিটেমাটির মায়া কাটাতে পারেননি, তাঁরা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন; নাগরিক হিসেবে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। এই ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হয়েছেন, কিন্তু প্রতিকার পাননি। গফরগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সাংসদের নির্যাতনে এলাকাছাড়া মানুষের সংখ্যা সহস্রাধিক বলে দাবি করেছেন। নাম-ঠিকানা চাইলে তাঁরা ১০০টি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মুঠোফোন নম্বর দেন। তাদের মধ্যে ৩২টি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে প্রথম আলো। এসব পরিবারের সবাই গফরগাঁও ছাড়তে বাধ্য হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নির্যাতিত ব্যক্তিদের মধ্যে এলাকার সাবেক চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগের নেতা–কর্মীরা আছেন। ফাহমি গোলন্দাজ ছিলেন গফরগাঁও উপজেলার চেয়ারম্যান। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি সাংসদ হন।

তাঁর বাবা আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ ১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত এই আসনে আওয়ামী লীগের সাংসদ ছিলেন। সে সময় দেশজুড়ে যে কজন সাংসদ ‘গডফাদার’ বলে পরিচিতি পেয়েছিলেন, আলতাফ গোলন্দাজ ছিলেন তাঁদের একজন। তাঁর মৃত্যুর পর ওই আসনে সাংসদ হন আওয়ামী লীগের ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াস উদ্দিন আহমেদ। তখন ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিনের অনুসারীদের নির্যাতন–নিপীড়নেও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন বলে দাবি করেছেন গফরগাঁওয়ের দলীয় নেতা–কর্মীরা। তাই সাংসদ পরিবর্তন হওয়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন তাঁরা। কিন্তু এখন তাঁরা বলছেন, বর্তমান সাংসদ ফাহমি গোলন্দাজ আগের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন।

সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, বালুমহাল দখল, জমি দখলসহ সব অপকর্মের অভিযোগের আঙুল তাঁর অনুসারী ‘গোলন্দাজ বাহিনী’র দিকে। ৭ অক্টোবর গফরগাঁও যান এই প্রতিবেদক। শুরুতেই স্থানীয় লোকজন সাবধান করেন, সাংবাদিক এসেছেন জানতে পারলে ‘গোলন্দাজ বাহিনী’র হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা আছে। রাতে কোনোভাবেই গফরগাঁওয়ে না থাকার পরামর্শও দেন তাঁরা। অগত্যা ময়মনসিংহ থেকে গফরগাঁওয়ে যাতায়াত করে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। দিনে গিয়ে উপজেলার রসুলপুর, বারবাড়িয়া, সালটিয়া ও যশরা ইউনিয়নে সাংসদের অনুসারীদের হাতে নির্যাতনের শিকার নয়টি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাঁরা কথা বলতে রাজি হননি। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললে তাঁদের আবার নির্যাতন করা হবে। একটি পরিবারের সদস্যরা জানান, একবার তাঁরা একটি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।

পরে অস্ত্রের মুখে ‘তাঁদের সঙ্গে কিছু হয়নি’—এমন লিখিত বক্তব্য দিতে বাধ্য করেন সাংসদের অনুসারীরা। নির্যাতনের শিকার গফরগাঁও পৌরসভার সাবেক মেয়র ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক আইনজীবী কায়সার আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এর চেয়ে খারাপ অবস্থা আর দেশে কোথাও আছে বলে মনে হয় না। নুন থেকে চুন খসলেই পিটিয়ে এলাকাছাড়া করা হচ্ছে। সরকারি যেসব উন্নয়ন প্রকল্প আসছে, সেগুলোর যথাযথ কাজ হচ্ছে না। উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ ফরহাদ ও ছাত্রলীগের রাউনা ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি শাওন হাসনাত সাবেক সাংসদ গিয়াস উদ্দিন আহমেদের অনুসারী।

তিনি বলতে থাকেন, ‘যারা জনপ্রিয় ব্যক্তি আছে, তাদের বিরুদ্ধে লিখে আপনারা নির্বাচনের আগে বিতর্কিত করেন। আমি যদি সেই মিশনে পড়ি, তাহলে তো আপনি আপনার কথাই লিখবেন। আমার পক্ষে লিখবেন না।’ ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিরুল হক গফরগাঁওয়ের বিষয়ে কোনো কথাই বলতে রাজি হননি। তবে গফরগাঁও এবং ময়মনসিংহ আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি। ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সাংসদ ফাহমি গোলন্দাজ ও তাঁর অনুসারীদের অত্যাচারে দলের লোকজন যে এলাকাছাড়া, তা কেন্দ্রীয় নেতাদেরও জানানো হয়েছে।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিজবাহউদ্দিন সিরাজের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাংসদের কারণে দলীয় লোকজনের এলাকাছাড়ার বিষয়টি আমরা জানি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকেও জানানো হয়েছে।’ সাংসদের বিরুদ্ধে কখনো কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না, বা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সবার নজরেই আছে।’

আরও পড়ুন: ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের কাছে ক্ষমা চাইতে মাসুদা ভাট্টিকে লিগ্যাল নোটিশ

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে গ্রেফতারে ড. কামালের উদ্বেগ, আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা

ফেসবুকে লাইক দিন