আইনি লড়াইয়ে যত যুক্তি ধানের শীষের প্রার্থীদের

ইমান২৪.কম: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ করে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের ধানের শীষের প্রার্থীরা। বুধবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ও বৃহস্পতিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত মোট ৭৮ প্রার্থী মামলা দায়ের করেছেন। এসব আবেদনের শুনানি হবে নির্বাচনী আবেদনের এখতিয়ার পাওয়া হাইকোর্টের ৬টি একক বেঞ্চে। তারা সবাই গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জালভোট, কেন্দ্র দখল, এজেন্টদের বের করে দেয়া, প্রকাশ্যে ব্যালট পেপারে নৌকায় সিল মারতে বাধ্য করা, অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটের আগের রাতেই সিল মারা, প্রার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেফতারসহ নানা অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে নির্বাচন বাতিল করে আবারও ভোটের দাবি করেন। আবেদনকারীরা বিজয়ী প্রতিদ্বন্দ্বীর ফল বাতিল এবং সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসনের পুরো নির্বাচন বাতিল চেয়েছেন।

আবেদনে নির্বাচনের আগের রাতে বেশির ভাগ কেন্দ্রে ব্যালটবাক্স ভরে রাখা, বিএনপির পোলিং এজেন্ট ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোট কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনে বাধা, ভোটারদের ভয় দেখানোসহ নানা অভিযোগ এনেছেন প্রার্থীরা। এসব আবেদনে বলা হয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৃত ব্যক্তি ‘ভোট’ দিয়েছেন। কোনো কোনো কেন্দ্রে ৯৭ থেকে ৯৮ ভাগ ভোট পড়েছে। এ ছাড়াও নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘ওই নির্বাচন আইন অনুযায়ী কোনো নির্বাচনই ছিল না।’ নির্বাচনী আবেদন একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় করতে হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) এর ৫১ (২) ধারায় বলা হয়েছে আবেদনকারী নির্বাচিত প্রার্থীর জয় বাতিল, আবেদনকারী বা অপর কোনো প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণা এবং পুরো নির্বাচন বাতিল চাইতে হবে। ওই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই আবেদন করা হয়। আরপিও’র বিধান অনুযায়ী নির্বাচনের পর প্রকাশিত ফলাফলের প্রজ্ঞাপন জারির ৪৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আপত্তি বা ফলাফল চ্যালেঞ্জ করতে হবে। সে হিসেবে শুক্রবার আবেদন দাখিলের শেষ দিন।

কিন্তু সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ার কারণে বৃহস্পতিবারই ছিল আবেদনের শেষ সময়সীমা। তবে আইনজীবীরা জানিয়েছেন তামাদির কারণ দেখিয়ে পরেও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। একেকজন আবেদনকারীকে ১০টি করে পৃথক আবেদন জমা দিতে হয়েছে। বিবাদী করা হয়েছে নির্বাচন কমিশন, নিজ নিজ আসনের প্রার্থীদের। এসব প্রার্থীদের বিবাদী করে তাদের প্রতি নোটিশ প্রদান এবং সাক্ষীদের তলবের আরজি রয়েছে আবেদনে। সূত্র জানিয়েছে, গত ২৯ জানুয়ারি প্রথম ঢাকা-৬ আসনের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ধানের শীষের প্রার্থী ও গণফোরামের অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন। দ্বিতীয় আবেদনটি গত ৪ ফেব্রুয়ারি গণফোরামের অপর প্রার্থী মানিকগঞ্জ-৩ আসনের মফিজুল হক খান কামাল দায়ের করেন। তৃতীয় আবেদনটি ৬ ফেব্রুয়ারিতে কুড়িগ্রাম-২ আসনের মেজর জেনারেল (অব.) আ আ ম স আমিনের।

৭ ফেব্রুয়ারি করেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। এরপর গত ১২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাইফুল ইসলাম ফিরোজ আবেদন করলে দুই দিনে ১৪টি আবেদন জমা পড়ে। বৃহস্পতিবার শেষ দিনে ৫৬ জন আবেদন করেন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায়। গত ১ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন হাইকোর্টের ৬টি একক বেঞ্চকে নির্বাচনী আবেদন নিষ্পত্তির এখতিয়ার দেন। নির্বাচনী আবেদন নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি সৌমেন্দ্র সরকার, বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান, বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক, বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান, বিচারপতি মাহমুদুল হক ও বিচারপতি কাশেফা হোসেনের একক বেঞ্চকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

একক বেঞ্চের এখতিয়ার সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট একক বেঞ্চের কার্যতালিকায় এখতিয়ার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে ‘২০০১ ইং সনের গণপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধন) অধ্যাদেশ দ্বারা সংশোধিত ১৯৭২ইং সনের গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ মোতাবেক ‘নির্বাচনী’ আবেদনপত্র; যেসব বিষয় এই বেঞ্চে স্থানান্তরিত হইবে তার আবেদনপত্র গ্রহন করিবেন।’ মাগুরা-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নিতাই রায় চৌধুরী সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদনে স্বাক্ষর করতে আসেন। স্বাক্ষর করতে করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ৩০ ডিসেম্বর দেশে কোনো নির্বাচন হয়নি। এ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আমরা এখন স্যাটেলাইট রাষ্ট্রের নাগরিক। আমরা জালিয়াতির এ নির্বাচন বাতিলের দাবি করছি। ঢাকার প্রার্থীদের মামলার দায়িত্ব পাওয়া আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘প্রতিটি নির্বাচনী আসনে ক্ষমতাসীন দলের প্রাার্থীরা যে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে, সে সম্পর্কে কতগুলো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যেগুলো আমরা আমাদের প্রার্থীদের কাছে থেকে পেয়েছি, সেগুলো আমরা আবেদনে উল্লেখ করেছি।’

উদাহরণ হিসেবে একটি মামলার অভিযোগের বিবরণ দিয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘ঝিনাইদহ ৪ আসনে বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগ করেছেন যে একটি কেন্দ্রে মোট ভোটার ২২৬২ জন। সেখানে ভোট পড়েছে ২২৫১টি। সেখানে ভোটার তালিকা থাকা ২৫ জন এরই মধ্যে মারা গেলেও রিটার্নিং অফিসারের হিসেবে দেখা গেছে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হননি ভোটার তালিকায় থাকা মাত্র ১১ ব্যক্তি। তাহলে ১৪ জন মৃত ব্যক্তি কি ভোট দিয়েছেন? কে কবে মারা গেছে সেটা আমরা আবেদনে উপস্থাপন করেছি।’ ৭৪ জন আবেদনকারী হলেন– অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, ঢাকা-৬, মফিজুল ইসলাম খান কামাল (মানিকগঞ্জ-৩), মেজর জেনারেল (অব.) আ আ ম স আমিন (কুড়িগ্রাম-২), আব্দুল মোমেন চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১৫),

সাইফুল ইসলাম ফিরোজ (ঝিনাইদহ-৪), আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী (টাঙ্গাইল-৭), অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন (বরিশাল-৩), রুমানা মাহমুদ (সিরাজগঞ্জ-২), জহির উদ্দিন স্বপন (বরিশাল-১), শাহ রিয়াজুল হান্নান (গাজীপুর-৪), নাসের রহমান (মৌলভীবাজার-৩), আব্দুল হাই (মন্সিগঞ্জ-৩), হাফিজ ইব্রাহিম (ভোলা-২), রুহুল আমিন দুলাল (পিরোজপুর-৩), ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন (ঢাকা-১৯), হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (ভোলা-৩), তাসভীর উল আলম (কুড়িগ্রাম-৩), মো. সাইফুল ইসলাম (রংপুর-৬), মো. সাদেক রিয়াজ (দিনাজপুর-২), মোস্তফা মহসীন মন্টু (ঢাকা-৭), নজরুল ইসলাম আজাদ (নারায়ণগঞ্জ-২), মইনুল ইসলাম খান শান্ত (মানিকগঞ্জ-২), ইরফান ইবনে আমান অমি (ঢাকা-২), নবিউল্লাহ নবী (ঢাকা-৫), আশরাফ উদ্দিন (নরসিংদী-৫), মো. আমিরুল ইসলাম খান (সিরাগঞ্জ-৫), শহিদুল ইসলাম (টাঙ্গাইল-১), ফরহাদ হোসেন আজাদ (পঞ্চগড়-২), মো. হাসান রাজিব প্রধান (লালমনিরহাট-১),

মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১৬), মো. আকতারুজ্জামান মিয়া (দিনাজপুর-৪), মো. শাহজাহান মিয়া (চাাঁপাইনবাবগঞ্চ-১), মিজানুর রহমান (সুনামগঞ্জ-৫), জি কে গউছ (হবিগঞ্জ-৩), মজিবুর রহমান চৌধুরী (মৌলভীবাজার-৪), ফারুক আলম সরকার (গাইবান্ধা-৫), শফি আহমেদ চৌধুরী (সিলেট-৩), মো. আনোয়রুল হক (নেত্রকোনা-২), শাহ মো. ওয়ারেস আলী (জামালপুর-৫), নিতাই রায় চৌধুরী (মাগুরা-২), অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (যশোর-৩), মো. আবু সুফিয়ান (চট্টগ্রাম-৮),

মাসুদ অরুণ (মেহেরপুর-১), আমিন উর রশিদ (কুমিল্লা-৬), ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন (নোয়াখালী-১), শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া (খাগড়াছড়ি), সাব্বির আহমেদ (রংপুর-৩), মুন্সী রফিকুল আলম (ফেনী-১), জয়নাল আবদীন ফারুক (নোয়াখালী-২), সাচিং প্রু (বান্দরবান) শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক (চাঁদপুর-৩), আবুল খায়ের ভূঁইয়া (লক্ষ্মীপুর-২), জাকির হোসেন সরকার (কুষ্টিয়া-৩), রকিবুল ইসলাম (খুলনা-৩), শ্যামা ওবায়েদ ইসলাম (ফরিদপুর-২), আনিসুর রহমান (মাদারীপুর-৩), আজিজুল বারি হেলাল (খুলনা-৪), শাহ মো. আবু জাফর (ফরিদপুর-১), মো. শরিফুজ্জামান (চুয়াডাঙ্গা-১), হাবিবুল ইসলাম হাবিব (সাতক্ষীরা-১), আলী নেওয়াজ মো. খৈয়ুম (রাজবাড়ী-১)।

আরও পড়ুন: গরুর ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না: নরেন্দ্র মোদি

বাংলাদেশের পদ্মার মা ইলিশ সরিয়ে নিতে ভারতের নতুন 

ফেসবুকে লাইক দিন